পরিচিতি ও পাঠ প্রতিক্রিয়া

কাব্যগ্রন্থ: অনুভবে তোমারে‐ কবি দুর্গাপদ মণ্ডল- পাঠ প্রতিক্রিয়া

 ড রো থী দা শ বি শ্বা স


সম্প্রতি হাতে এলো দাদা কবি দুর্গাপদ মন্ডল-এর পরিচয় প্রকাশন, আরামবাগ, হুগলী থেকে প্রকাশিত কবিতা সংগ্রহ "অনুভবে তোমাকে"--- উপহার হিসেবে। কাব্যগ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত অক্টোবর ২০২২-এ। প্রথমেই চোখ টানে আশিসকুমার চট্টোপাধ্যায়কৃত প্রচ্ছদটি। পৃষ্ঠার কাগজও খুব উন্নতমানের। কাব্যগ্রন্থটিতে কবিপরিচিতি লিখেছেন উনারই পুত্রবধূ নবনীতা মন্ডল। কাব্যগ্রন্থটি কবি তাঁর পুত্রবধূকেই উৎসর্গ করেছেন। কবিতার সংখ্যা ৬৮, সাত দশ বারো লাইনের কবিতা যেমন আছে, তেমনি ঊনপঞ্চাশ বা ছাপ্পান্ন লাইনের কবিতাও আছে।

বইটির পেছনে, কভার পেজে শ্রদ্ধেয় কবির ছবিসহ সংক্ষিপ্ত কবিপরিচিতি লেখা। পড়ে মনে হলো- সাহিত্যসাধনার ক্ষেত্রে চরম আর্থিক প্রতিকূলতা কোনো বাধাই নয়। শুধু প্রয়োজন ভালোবেসে লিখে যাওয়া। তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি একজন শিক্ষক। শব্দভান্ডার পরিপূর্ণ হয় আদর্শ ও ন্যায়ের পথে থেকে সহজ সরল জীবনচর্চায়, গভীর জীবনবোধের প্রকাশে। কবিতাগুলিতে কবির পরিশীলিত ভাবনা চিন্তন ও মননের প্রকাশ স্পষ্ট।

দাদা নিজে হাতে কি সুন্দর একটা চিঠি লিখে দিয়েছেন--- আমি যত্ন করে রেখে দেবো নিজের কাছে--- চিঠির বয়ান আমি এখানে উদ্ধৃত করলাম----

কল্যাণীয়া ডরোথী,
কাব্যগ্রন্থটির দু'কপি পাঠালাম। একটি তোমার জন্য, আর অন্যটি, কবিতারসিক কাউকে তুমি দিতে পারো। আমি বিশ্বাস রাখি, বইটি তুমি যত্ন নিয়ে পড়বে। 

আর একটা কথা, পড়ে যদি ভালো লাগে বা উপযুক্ত বলে মনে করো, তাহলে বইটির একটা রিভিউ বা পাঠপ্রতিক্রিয়া যাই বলো,--- লিখিতভাবে পাঠিও। আমার Whatsapp no-এ এবং Face book এ। 

আন্তরিক শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা জেনো---

তোমার দাদা
দুর্গা মন্ডল।

পুনঃ- Ex teacher কথাটি লিখলাম, যাতে পিওন ঠিকানাটা দ্রুত খুঁজে পায়।- যদি কোনো কিছু লিখে পাঠাও।

কতবার যে পড়লাম চিঠিটা--- চিঠিটির ভাষায় একটা স্নেহার্দ্র মনের পরিচয় মেলে। 

দাদার এ উপহার আমি মাথায় নিলাম। প্রতিটি কবিতা পড়লাম আগ্রহ সহকারে, মন দিয়ে--- যেমন: 

কবি একটা গানের স্বরলিপি খুঁজে চলেছেন সেই কবে থেকে--- হয়তো বা চকিতে ফিরে পেয়েছিলেনও--- মাত্রাবৃত্তে, বিলম্বিত লয়ে--- নিঃশব্দে বয়ে গেলো যেন--- এমন একটি পছন্দের সুর খুঁজে চলা অনন্তকাল ধরে--- অথবা পেয়ে হারানোর রেশ নিয়ে বাকী পথ চলা--- মনের গোপনে লালিত এই যে আশা, এ যেন শুধুই দুরাশা--- এ যেন পাঠকেরই মনের কথা--- ব্যক্তিগত দুঃখবোধ বুঝি এভাবেই সার্বজনীন হয়ে ওঠে।

কবিমন একা পথ চলতে চলতে প্রাকৃতিক দৃশ্যে মুগ্ধতা রেখে গেলেও কিছুটা দ্বিধান্বিত। উপযুক্ত সফরসঙ্গীর অভাববোধ কবির চিত্তে দুঃখের ছায়া ফেলে। কবির ভাষায়--- "কোন্ টা আসল কোন্ টা নকল/ফিলমি সিটির এই দুনিয়ায়!/এই হাভেলি এই তো ধাবা, সত্যি কেবল তোমায় চাওয়া।

প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতে চাতকের ন্যায় অধীর অপেক্ষা কবির কলমে রূপ নেয়---"তুই নেই, পিওনও আনেনি কোনো/পাড়ভাঙা নদীর খবর;/মেঘেদেরও কৃপণ আঙুল/বৃষ্টি-চাওয়া পাখিকে শাসায়।"-পাঠকমন অভিভূত হয় এখানেই।

বেহাগে ললিতে ফুটে ওঠে প্রিয়জনের বিদায়ের ক্ষণ- মনে বিশেষ রেখাপাত করে এই লাইনটি- "যাওয়ার সময় বৃষ্টি আনতে নেই।"

"ভিতরে ভিতরে তীব্র ভাঙচুর শুনেছি,- যখন/ সব রক্ত শুষে নেয় অকরুণ ক্রোধী বৈশ্বানর,/ তখনই তো প্রাণপণে তোমার বৃষ্টির ধারাসারে/ স্নান করে শুদ্ধ হতে চাই হে পরম নির্ভর..." রবীন্দ্রনাথের প্রতি কবির সমর্পণের ভাষার মৌলিকত্বে অপার মুগ্ধতা পাঠকের।

আকাশভাঙা বৃষ্টিতে বিমোহিত কবিরও মন ক্ষণিকের বেদনায় ছেয়ে যেতে দেখেছি--- কবিতায়।

"ফুলের পিদিম ভাস্যা যাও হে/ সুজন নদীর বাঁকে,/পরাণ নাইয়া একলা যেইখান থাকে।- কইও তারে একখান কথা/ আমার বুকের বেদন-ব্যথা,- আন্ধার রাইতে ভরা গাঙে/ ডিঙা নাহি বাও।"---যে প্রেম বহির্জগতের দর্শণ-স্পর্শনে সীমাবদ্ধ, সে প্রেমে পবিত্রতার মতো আধ্যাত্মিক বিষয়টি লঙ্ঘিত হয়। বরং "নিরখিয়ে প্রেম নিকষিত হেম"-যেন শুধুই প্রেম, শুদ্ধ প্রেম--- যেখানে শুধুমাত্র ফুলের পিদিম ভাসিয়ে দয়িতের জন্য মঙ্গলকামনা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

কবি দুটি কবিতা পাশাপাশি সাজিয়েছেন--- একটি "নিরখিয়ে প্রেম, নিকষিত হেম", অপরটি "বসন্তদিন হই"- প্রথম কবিতাটিতে আঞ্চলিক ভাষায় এতো গভীর প্রকাশ যে কবিমনের, সেই কবিমননই দ্বিতীয় কবিতাটিতে অপেক্ষাকৃত সলাজ হলেও কিছুটা চপলভঙ্গীতে প্রকাশ করেছেন হৃদয়ের প্রেম।--- দুটোর প্রকাশভঙ্গীতেই পাঠকমন সিক্ত, প্রকাশে বৈপরীত্য- পাঠকমন অভিভূত, গুনগুন করে যেন গেয়ে ওঠে--- "চপল তব নবীন আঁখি দুটি/সহসা যত বাঁধন হতে আমারে দিল ছুটি/----- আমের বোল, ঝাউয়ের দোল, ঢেউয়ের লুটোপুটি---/বুকের কাছে সবাই এল জুটি।"--- ঠিক যেন "বসন্তদিন"-এর মতো।

একটি মিষ্টি কবিতা- "ছায়া জোনাকি"। এই কবিতায় "রাতের বেহাগ", "ভোরের ভৈঁরো"- শব্দাবলির প্রয়োগ কবির সঙ্গীতরসিক মনের পরিচায়ক।

কিসের আশায়, কার "প্রতীক্ষায়" থাকে মন? যা চাওয়া যায়, তা কি সাথে সাথে পাওয়া যায়? ধৈর্য্যসহকারে প্রতীক্ষা করতে হয় অভীষ্টসিদ্ধির জন্য, ইচ্ছেপূরণের জন্য। কবির ভাষায়- "দাঁড়িয়ে থাকা দাঁড়িয়ে থাকাই সর্বকালীন,/প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে নীল চরাচর;/বৃষ্টি এসে হয়তো জুড়োয় তপন- তাপন---/জুড়োয় সেটা সত্যি নাকি?--/এই ভাবনাই অষ্টপ্রহর।"

তেইশটি শব্দে, নয় লাইনের একটি অণুকবিতা--- "কথা ছিলো"--- দুঃসময়ে কত কথাই তো দিয়ে থাকি এ জীবনে, সুদিন এলে  ভুলে যাই সেই শপথের কথা--- কথার মূল্য ক'জন রাখতে পারি? চলতে চলতে কত সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সব কথা যেমন রাখতে পারিনা, সব সম্পর্কও টিঁকে থাকে না- এই সত্যদর্শন প্রকাশে ভাবের গভীরতায় কি ওজনদার কবিতা লিখেছেন কবি।

এ ভুবন ভালোবাসার নয়- এ ভুবনে ভালোবাসার সাথে জড়িয়ে থাকে প্রত্যাশা। প্রত্যাশা পূরণের চাপে সময় অতিবাহিত হলে ভালোবাসবে কখন? নদীর কাছে মনের কথা বুঝি বা বলা যায়। নদী  সত্যিই দুঃখবেদন জমিয়ে রাখে, সে সব জানে। নীরবে বয়ে যায়। কখনো ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঠিক যেন ভালোবাসার জোয়ার এলে। এটাই নদীর ধর্ম। দিনের কর্মোদ্দীপক উজ্জ্বল আলোয় ভাবনারাও বিক্ষিপ্ত, --- কবি তাই "ফুটলে সাঁঝে তারার টগর" আলোয় ভরা অন্য কোনো ভুবনে যেতে চান--- যার নাম হতে পারে জীবনপুর বা আরশিনগর। কবির ভাষায়---"যাচ্ছি কোথায়? জীবনপুরে,/কেউ কি জানে জীবন মানে?/নদীই জানে।/জীবন মানে বন উপবন/অন্য ভুবন।/পুরনো সব অনেক কথা/অনেক দুঃখরাতের ব্যথা/যত্নে নদী জমিয়ে রাখে/পাথর এবং পদ্মপাতায়।----"

কবির প্রকৃতিপ্রেমের পরিচয় কাব্যগ্রন্থে কবিতাগুলির ছত্রে ছত্রে। দুটি দেবদারু বৃক্ষ বিজন পাহাড়কে সাক্ষী রেখে ভালোবেসে পাশাপাশি--- আষাঢ়ের প্রথম দিন, বৃষ্টিতে ভিজছে। এ দৃশ্য দেখে কবির ভাবনা মেলে দেয় ডানা--- কবির মনে প্রশ্ন জাগে: "ক্ষুব্ধ ঝড়/মাঝে মাঝে/ছুঁইয়ে দেয় ওদের/ওষ্ঠাধর/প্রেম কি হারায়/অথবা/মেঘের আড়ালে/চকিত দামিনী!/শিয়রে বশিষ্ঠ অরুন্ধতী!/কে জানে,--/পোস্টমর্টেম তো হয় না।"

দূষণজর্জরিত প্রকৃতি ও পৃথিবী কবির মনে রক্তক্ষরণ ঘটায়। কবির কলমে হাহাকার ফুটে ওঠে, সৃষ্টি হয় "একটি নদীর কথা।" সৃষ্টির আদিতে প্রকৃতি বড় সুন্দর ছিলো। মানুষের ছিলো পবিত্র মন। সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর বয়স গেছে বেড়ে। নদীমাতৃক সভ্যতার আলোয় একদা যে "সম্পন্ন নগরী"-র জন্ম হয়েছিলো, মানুষের কার্যকলাপে শৈবালদামবিজড়িত নদীর জল আজ নাব্যতা হারিয়ে "কল্লোলিনী তিলোত্তমার বিদীর্ণ লাশ বুকে/ক্লান্ত, ধ্বস্ত।" কবি সংশয় প্রকাশ করেন- "বেদনায় নীল হয়ে যেতে যেতে/তুঙ্গভদ্রা, শতদ্রু, বিতস্তা, মেঘনা, ময়ূরাক্ষী/একদিন প্রতিদিন/থেকে যাবে হয়তো বা/অজন্তার খন্ড গুহাচিত্রে।।"

আমরা নিজেকে কতটুকু চিনি? আমরা খুব কাছের মানুষকেও তাই সঠিকভাবে চিনতে পারি না। প্রিয়জনের আকাশচুম্বী প্রত্যাশাপূরণে ব্যর্থ হলে সেই প্রিয়জনের কাছ থেকে আঘাত পেলে অভিমানী হয়ে ওঠে মন। কবির লেখা "ভুল প্রতিকৃতিতে মালা"- তেমনই একটি কবিতা, যেখানে কবি বলেছেন: "তুমি ভুল প্রতিকৃতিতে মালা দিয়ে গেছো অগ্নিমিতা।/ছবির মানুষটা কতকটা আমারই মতো, তবে আমি নই।/...... আসলে ভুল করেছে শিল্পী নিজে। আঁকতে চেয়েছে একটা গোটা/মানুষ, এঁকেছে আদ্দেক।/তথাকথিত গুণগুলো রেখায় লেখায় ফুটে উঠেছে বটে, কিন্তু/তার কৌণিক ত্রুটিগুলো ঠিকঠাক জাগাতে পারেনি।"

একটি মনুষ্য জীবন বুঝি এমনই হয়। শৈশব বড় সুন্দর। বাঁশির মধুর সঙ্গীতসুরে বয়ে যায় ছেলেবেলা। তারপর বহু ঝড়ঝঞ্ঝার কাল পেরিয়ে বড়ো হওয়া। সূর্যমুখীর মত সূর্যের দিকে তাকিয়ে সত্যকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে গিয়ে অসিও তুলে নিতে হয়। সংগ্রাম করে বাঁচতে গিয়ে মৃদঙ্গের তাল কেটে যায়। হাতে তুলে নিতে হয় বেলচা। জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হতে হতে সেই মানুষটি জীবন্মৃত হয়ে কাটিয়ে দেয় আয়ুষ্কালের আরো কতটা সময় যখন সে আর মনুষ্যপদবাচ্য থাকে না। অথচ সর্বকালেই প্রতিটি শিশুর শৈশব কতই না সুন্দর! কবির ভাষায়--- "আজও সেই নদী/নূপুর বাজায় রোজ/সেই আশ্রমিক বকুল/ডাল মেলেছে অজস্র/ফুল ফুটিয়েছে ঢের।/মানুষটি শুধু আজ নেই।/বাঁশিটি কিন্তু/এখনো বাজছে,---/বাজছেই।।"

'পথের পাঁচালী'-র সর্বজয়াকে মনে করে 'অন্য পরবাসে'- নামক কবির যে কবিতা--- সে এক অসাধারণ প্রকাশ। "দেখা হয়েছিল ধূসর বিকেলে;/বলেছিলাম: কেমন আছেন?/উত্তরে কোনো দিকে না তাকিয়ে/নন্দনের নরম আলোয়/অনুচ্চ উচ্চারণে বললেন:/রোদ্দুর বোধ হয় নিভে এলো।--- কি অনবদ্য উচ্চারণ! --- "মমার্তের বিষন্ন বিকেলে/দেখা হলো আরো একবার,-/তিনি চলে যাচ্ছেন;/নৈঃশব্দ্যের প্রান্তর ছুঁয়ে/নির্বেদ একাকী।--" বিস্মিত হতে হয় কবিতার শব্দচয়ন ও ভাবব্যঞ্জনায়।

"যে- মানুষ কথা বলেনা, দরজার আড়ালে থেকে কেবল উঁকি দিয়ে/যায়,-- তারই জন্যে এক আকন্ঠ তৃষ্ণা কুরে কুরে খায় আমাকে।"--- 'একটি মিসড্ কল এবং আমি'- কবিতায় এই যে লাইনগুলি--- জীবনে অন্ততঃ একবারও অত্যন্ত মানবিক ও অনুভবী কেউ এ অনুভবের শরিক হননি--- এ কথা বিশ্বাস করা সত্যিই অসম্ভব। "ওগো অলৌকিক মানুষ-- সাড়া দাও। কথা বল, কথা বল---।"  ---অজানাকে জানার ব্যাকুলতা চিরন্তন। এখানেই কবিতার সার্বজনীন হয়ে ওঠা।

কলমের কালিতে কত যত্ন করে চিঠি লেখা হত। খুব গুছিয়ে প্রকাশিত হত ভাবনার প্রতিফলন--- কত আবেগমথিত হৃদয়ের না-বলা কথা--- কখনো অশ্রূরসে, কখনো তা কাব্যরসে সিক্ত। পত্রপ্রেরকের উদ্বেগ থাকে চিঠির উত্তর পাবো কিনা, অথবা কবে আসবে সেই উত্তর? পত্রপ্রাপকের মন ভরে যাবে আনন্দে, কবে পাবো চিঠি। উভয়ক্ষেত্রেই "স্বপ্নময় লিপি"-র অপেক্ষা--- যার "একেকটি শব্দে ছিলো কত শত রাগ ও উত্তাপ,/ শোকে ছিলো সান্ত্বনার বিশল্যকরণী" যা  বাড়াতো ধৈর্য্য ও সহনশীলতা। আর আজ? ফোনের কি প্যাডে আঙুল ছুঁইয়ে লিখে লিখে জানানো, চোখের ক্লান্তিহরণ করার পন্থা জানা নেই। কবির ভাষায়--- "ফোনের প্রান্ত থেকে যান্ত্রিক সংলাপগুলি/ছিঁড়ে নিচ্ছে দু'চোখের লাবণ্যের পলি।" সব শেষে কবির আকুল প্রার্থনা--- "আজ হৈমন্তী গোধূলি;/একটা দিন অন্ততঃ এবার/তোমার টেলিফোনটা অচল রেখো বিদিশা---/তোমার চিঠির জন্যে এই আমি কান বন্ধ রাখলাম;/আর আমার এ চিঠি/তোমাকে ফের পাঠিয়ে দিলাম/সপ্তপর্ণী পাতার গন্ধ মিশিয়ে---/তোমাকে এবং তোমাকেই।/তুমি তোমার চিঠির জন্য পাঠিয়ে দিও/একটা ল্যাভেন্ডার ডিউ।।"

একজন সুজন যুদ্ধরত সেনাপতি, কবির শ্রদ্ধেয় অগ্রজপ্রতিমের প্রয়াণে কবি লিখেছিলেন "মহার্ঘ সঞ্চয়ের কড়িগুলি"--- শূন্যসিঁথি আলপথে ইদানীং/বয়ে যাচ্ছে উদাসীন হাওয়ার মর্মর;/অভিমানী  আমের মুকুল/ঝরে যায় শব্দহীন।/ফুরোলো দিনের কাব্য!/গান তবে কোথা রাখি?------অগ্রজপ্রতিম সখা--/তোমার দেওয়া কড়িগুলি তবে/তুলে দিচ্ছি আমি/পথের দুধারে জাগা/যুদ্ধরত আরো ক'টি সৈনিকের হাতে।"--- অন্তরের অনুভব ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কি অসাধারণ শব্দচয়ন!--- এ গভীরতা যে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়, অনবদ্য প্রকাশ!

"নক্ষত্রের দল ঝরে গেছে ভোরে/মৌনের নূপুর শূন্য শয্যার উপরে,/ চুম্বনের মতো দূর বলাকার ছায়া/মিলিয়েছে দিগন্তরেখায়----"এই তো সময়--- প্রেমিকার কাছ থেকে বিদায় নেবার---  কবির পক্ষেই এমন বিদায় সম্ভাষণ সাজে----।

রোমান্টিক কবির ঘুম নেই চোখে, জিরো বাতির আলোয় স্মৃতিতাড়িত মন কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়--- "স্মৃতির অ্যালবামে মধ্যযামে"-র মত কবিতা--- যার অনবদ্য শেষ চারটি লাইন হলো---"পুরানো তোরঙ্গ খুললে/রাগ-রক্তপাত,/অলিন্দে অকাল বৃষ্টি/নিঃশব্দ প্রপাত।"

এভাবেই তিনি পাঠকের হাতে তুলে দিচ্ছেন--- "ভাবীকালের স্বপ্নময় আখরগুলি।" তিনিই তো এক অবিচল ধ্রুবতারা--- যিনি স্বয়ং তাঁর কাব্যজ্যোতিতে পথ দেখান, আলোকিত করেন পাঠকের মন।

"তুঙ্গভদ্রাতীর থেকে দিগন্তের দিকে---- ইলোরার স্বপ্নময় গুহাচিত্রে,----- চাঁদনীর নীল বেলাভূমে, বৈশালীতে, বিদিশার রাজপথে, অবন্তিনগরে, অথবা মঙ্গলগ্রহে স্বপ্নে সংরাগে"---হাতে হাত রেখে অনন্তের পথে হেঁটে যায় যারা কবি যেন তাদেরই একজন।

মধ্যযৌবনে এসে একবার পিছনপানে যেখানে "ক্রমাগত ভেঙে যায় আকৈশোর সোনার ঘুঙুর" সেথা ফিরে তাকাতে চায় মন, আবছা অতীত--- "অশরীরী ছায়ারা যেমন"।- কবির এ অনুভব তোমার আমার সবার।

জ্যোৎস্নার বর্ষণ যখন বালুচর প্লাবিত করে তখন সে হয়ে যায় বালুচরী জ্যোৎস্না। বৃষ্টি মানে প্রথম কদম--- রাত্রির চোখে না কি ত্রিবেণী সঙ্গম--- হাতের মুদ্রায় অমলাশঙ্কর, চোখের নৌকো, কাঁদলে নিঃশব্দ নূপুর---সদ্যফোটা  তিলফুলে বসে থাকা মৌমাছি--- আরণ্যক গেরস্থালি--- সকালে পৌষ আসবে,/অন্তর্বাসহীন কালো কালো রমণীরা/লাল পাড় শাড়ি পরে/আলপনায় সাজাবে আঙিনা/বৃদ্ধ প্রপিতামহ/হুঁকোতে একবার টান দিয়ে বলবেন:/কই গো মা লক্ষ্মীরা/ - শাঁখ বাজাও, উলু দাও/পউষ এসেছে দোরগোড়ায়।/ রান্নাঘরের পাশে/ ঢেঁকিতে প্রথম পাড় পড়বে/এয়োতির পায়ের ছোঁয়ায়/তারপর সারারাত ধরে/ দেখতে থাকবো/আলতাপরা পায়ের দুলুনি/কাহারবা নাকি দাদরায়,/ত্রিতালে অথবা চৌতালে!/আগুনের আঁচে তখন সমস্ত বিধ্বস্ত মুখ/স্থির পানপাতা;/চোখ রেখে কুয়াশার নিঃসীম ইজেলে/ওরা ধান ভানে, পাড় দেয়;/অরণ্যের মধ্যরাতে আদিগন্তে ক্রমাগত/পাড় দেয় ওরা।।" কি সুন্দর দৃশ্যায়ন--- আহা--- আর এসবই যে কবির "মগ্ন উচ্চারণ", এমন সব কাব্যিক শব্দচয়নে পাঠক মন বিস্মিত না হয়ে পারেনা।

সাবলীল, স্বতঃস্ফূর্ত ও অন্তর্দীপ্ত প্রকাশ দেখি "বিপন্ন হেরিটেজ" কবিতায়--- বিবর্ণতায় বিস্মরণের আলোয় বার্মাটিক বর্গায় নিঃশব্দ টান, খুবলে নেওয়া ইঁটগুলো--- কবিকে যন্ত্রণা দেয়। তিনি যেন বিল্ডিংএর শেষ কেয়ারটেকার, যাঁকে চোখ রাঙিয়ে তাড়া করে ফেরে একুশ শতকের নির্মম প্রোমোটার। কবির জায়মান চেতনার ছায়ায় গড়ে উঠেছে এক অত্যাশ্চর্য কথা ও কাহিনী।

কাব্যগ্রন্থটির মাঝে কিছু কবিতা আছে যেখানে কবির আর্তি দেখেছি হৃদয়জ। কবি খুঁজেছেন নিত্য নতুন শব্দ, শব্দের ব্যঞ্জনা, আঁকতে চেয়েছেন অনন্য চিত্রকল্প। গভীর সংবেদী অনুভব ছত্রে ছত্রে। প্রকাশশৈলিতে বৈচিত্র্য, বয়নে মসৃনতা--- কাব্যিক পেলব স্পর্শে উজ্জীবিত, প্রকাশের সারল্যে, ভাবব্যঞ্জনার প্রগাঢ়তায় নিবিষ্ট, সংবেদে তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে পাঠকের মন।

✍️ডরোথী দাশ বিশ্বাস
     (শব্দসংখ্যা- ১৮৪৮)

[লিখেছিলাম যেদিন, সে দিনটা ছিলো ২৬ জুন, ২০২৩]





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পঞ্চম বর্ষ || প্রথম ওয়েব সংস্করণ || শারদ সংখ্যা || ১১ কার্তিক ১৪৩২ || ২৯ অক্টোবর ২০২৫

চতুর্থ বর্ষ || চতুর্থ ওয়েব সংস্করণ || বাদল সংখ্যা || ১২ শ্রাবণ ১৪৩২ || ২৯ জুলাই ২০২৫

কবিতা