কবিতা

ওখানে যেও না

দু র্গা প দ ম ন্ড ল

এখনো মানুষ যায় কেঁদুলির পউষ মেলায়
সুবর্ণরেখার পারে বেলা-অবেলায়?

হাঁটুজল ছুঁয়ে থাকে বালির কিনারা 
সেইসব অভিমানী পলাতক গাছের ছায়ারা
এখনো তোমাকে ডাকে 
          শীত নেমে এলে 
        হেমন্তের রঙহারা কুয়াশায়!

নদীতে গোধূলি তখন আদিগন্ত জুড়ে;
হয়তো তুমিই তখন গানের ওপারে।

কে তোমার মনের মানুষ, 
         কে বাজায় হাতের দোতারা!
ভুবনডাঙায় জাগে অসীম সাহারা।

হেমলতা ছুঁয়ে আছে তোমার চোখের পাতা 
এবং বিষাদমাখা কিছুটা মমতা,
দু ফোঁটা চোখের জল রেখে যায় শেষ বরিষণ
মেঘেরা যেমন। 

দোতারায় রেখেছো আঙুল---
কোন্ সুরে গাও তুমি প্রেমময় উদাসী বাউল!

ওখানে যেও না তুমি একা একা ভুবনডাঙায়
পথরেখা মুছে গেছে, মনের মানুষ  যে সে নাই।।

('বাউল'-এর কবি শ্রদ্ধেয় রবীন আদককে)






পরিচয়

মা লা  চ্যা টা র্জ্জি

ছেড়ে রাখা শাড়িটা তেমনি
পড়ে আছে এখনও আলনাতে,
ঘর সংসারের ব্যস্ততা নেই,
অসমাপ্ত আশা নেই,
সুন্দর করে সেজে গলা বাড়িয়ে
‘দ্যাখো তো কেমন লাগছে’
স্মিত হেসে বলা নেই,

নিথর আমাকে এইবার নিয়ে যাওয়া হবে। 
বাইরে মহাপ্রস্থানের গাড়ি,
আবালবৃদ্ধবনিতার দল,
বারোটা বাজে, 
এবার আমাকে বিদায় দিতে হবে। 
 আজ খেলাঘরের শেষ। 
আজ আবার নতুন করে পরিচয় শুরু হোক।




কিশোরী

শ র্মি ষ্ঠা  মি ত্র  সে ন গু প্ত

বই খুললেই বিভ্রাট
দু'মলাটের ভেতর থেকে সারিবদ্ধ অক্ষর নেমে আসতে থাকে-
বেজে ওঠে বিভাস মালির মরমিয়া বাঁশি
আলপথ হেঁটে যায় ঝকঝকে রোদ্দুর মাড়িয়ে
পড়ার টেবিলে গড়িয়ে আসে মাধবীলতার গাঢ় গোলাপি রঙ 
আকবরের রাজনৈতিক নীতি পাশ ফিরে জায়গা দেয় মেজদার ঠুমরীকে
সুরের আলো ভাসিয়ে দেয় পোড়া অশ্বত্থতলার শান বাঁধানো চত্বর।
মনে মনে কিশোরী পাড়ি দেয় স্বচ্ছতোয়ার ঘাটে- নদী আর কিশোরী আজ এক যে!






নিজ নিকেতনে চলো
 
দে বা শী ষ  স র খে ল

তোমার ভেতরে কি অবাধ্য পাগল?
 তোমার শরীরে কি অবাধ্য পাগল?
 কথা শুনছে না, কথা রাখছে না 
 মাছ দিয়ে শাক ঢাকতে চাইছে সমস্ত দিন।
শরীর যেন তোমার নয়।
কাছের মানুষজন দূরে 
দূরের মানুষজন আগলে রাখছে আত্মাহীন অনুভূতিহীন শরীর।
 মনে নাই কুসুম, বনেও নেইকো কুসুম।
কুকুর ছিঁড়ে নিয়ে গেছে হৃদয় মস্তিষ্কের কথা কেউ শুনছে না। 
 হাত পা কান কেউ যেন শরীরের প্রতিবেশী নয় আর।






কিশলয়কাল

শ র্মি ষ্ঠা

ইচ্ছেগুলো শানবাঁধানো মেঝের মতো জমছে
জমছে আর গায়ে গায়ে আঁটছে।
একটা… তার ওপর আরেকটা… তারপর আরও একটা…
জমতে জমতে ইচ্ছাপাহাড় হল
মাথাছাটা সমতল। ওপরে মেঘের বাড়ি।

আমরা পাহাড়ি সিঁড়ি ধরে উঠলাম
ওই বাড়ির চাতালে বসে
শালপাতাল ঠোঙায় পিঠে খাচ্ছিলাম
মায়ের হাতের…

ক্রমে, নীল মেঘ সরিয়ে লাল মেঘ
ঘন হিমেল কুয়াশা থেকে হওয়ার ফাগ
খানিক হাওয়া মেখে দুহাতে নিয়েছি রডোডেনড্রন
দেখি স্নানশেষে মায়ের ভিজে নরম চুলের জলে
টুপটাপ ভাঙছে মেঘের বাড়ি
এখন ভেজার সময়।

ইচ্ছেরা আলগা হচ্ছে
সপ্রতিভ ইচ্ছাডানা।
মৃত্যুব্যাধিভয় অস্তিত্বহীন
বালিকামন জলের দানা কুড়িয়ে নিচ্ছে ফ্রকের কোঁচড়ে
আস্তে… আস্তে…







ঋতু হেমন্ত

তা প স  কু মা র  পা ল 

ঝরে যাওয়া কাশ, ধান কাটা জমি,
ভোরের শিশিরে কয়েকটা শিউলি,
শুকিয়ে যাওয়া পদ্ম, খেজুর গুড়ের গন্ধ,
এলো হেমন্ত, এলো হেমন্ত!

প্রকৃতিতে হেমন্ত, শরীরে হেমন্ত, মনেও হেমন্ত!
হেমন্তে চঞ্চল মানুষগুলো বড় স্থির হয়ে যায়,
থাকে না যৌবনের উদ্দীপনা, জীবনের খাতা খুলে লাভ ক্ষতির হিসেব করতে বসে মানুষ!
জীবনে কি পেলাম, কি করতে পারলাম,
কি নিয়ে গেলাম!

জীবনের হেমন্ত ঋতুতে শোনা যায় 
শীতের (মৃত্যুর) পদধ্বনি,
এক চরম বাস্তব।






অবহেলিত প্রেম

র ত্না  দা স 

সালংকারা স্বয়ম্বরা অলোকসামান্যা এক নারী। হাতে বরমাল্য। ধীর পদে নতনেত্রে রাজসভায় প্রবেশ।
রাজন্যবর্গের স্পর্ধিত অহংকারে রাজসভা মুখরিত। এত জাজ্বল্যমান 
রাজরাজনের মাঝে কে
ঐ রূপতাপস! নবদুর্বাদল শ্যাম তরুণকান্তি! 

অতলকালো দীঘিপক্ষ্মে শ্যামল ছায়া ছড়িয়ে যায়।
উদ্বেলিত হৃদয় যেন সব হারানোর সীমানায়।
এত রথী মহারথীর ভীড়ে এক শৈশব যেন উঁকি দিচ্ছিলো। দোলাচল চিত্ত।
হরধনুতে জ্যা রোপণ---
এই অসাধ্য সাধন হবে কি! 

তীব্র তীক্ষ্ণ টংকার ছড়িয়ে পড়ে মুখর রাজসভায়।
এত জনসমাগম আচমকা নীরব নিশ্চুপ। নবীন
তরুণ তনু হরধনু ভঙ্গ করলেন।
স্বয়ম্বরার মুখমন্ডল রক্তাভ উজ্জ্বল। মন হাতের আগেই বরমাল্য পরালো গলায়।

হলো চারচক্ষুর মিলন। পুষ্পবৃষ্টি...
দুটি হৃদয় মিলে গিয়েছিল প্রেম অভিঘাতে। সেদিন
এই অলোকসামান্যা নারী বৈদেহী অনাগত ভবিতব্যে ছিলেন সম্পূর্ন অনবহিত। মা বসুন্ধরা
তাঁর কন্যাকে আপন অঙ্কে আবার সমাসীন করবেন---
অজ্ঞাত ছিলেন।
এক জীবন প্রেম অনাদরে অবহেলায় ভুলুন্ঠিত
হয়েছিল। জানকী অবগত ছিলেন।
তবু কেন??
হৃদয় কি খুলে দেখিয়েছিলেন জানকী! দেখাতে
পেরেছিলেন কী! 

রুদ্ধবাক এক মানবী অকারণ পৌরুষ ঔদ্ধত্যের
শিকার হয়েছিলেন। প্রেম অবমাননার যূপকাষ্ঠে বলি হয়েছিল।

শ্রী রামচন্দ্র বীর রূপে ঘরে ঘরে পূজিত। অসহায়
গর্ভিনী পত্নী নিষ্কাশন অবশ্যই বীরত্বের নিদর্শন...







ঈপ্সিত

প্র গ তি  দে  চৌ ধু রী

বাতাস আজ বড্ড বেসামাল 
আজ সে ভীষন বন্য,
আজ সে বড়ই পাগল করা
দুঃসাহসী অদম্য।
তার উতল অনুরাগের ছোঁয়ায় 
আমার মন-কেমনের ভাবনাগুলো 
কেমন মাতাল হয়ে যায়।
তেমনি তুমি যদি বা হও আটপৌরে 
বাতাসের মতো হৃদয় নিয়ে এসো 
আমি ও মত্ত হবো,
হতে পারো বৃদ্ধ কিংবা তরুণ 
একটি যৌবনময় মন নিয়ে এসো 
কথা দিলাম হৃদয় ভাসিয়ে দেবো।







হিমেল অসুখে করাল শীত
  
সু মি তা  চৌ ধু রী

হিমেল হাওয়ার চাদরে
  কিছু ছাইরঙা কান্নার ছাপ,
 শিশির রেখার মাঝে
    ছুঁয়ে আছে গুমরানো ব্যথার উত্তাপ।

আকাশটা ভীষণ নীল সাজে সাজে আজ
   বিকেলকে বিষাক্ত করে,
মায়াবী সন্ধ্যার সব মায়া চুরি যায়
    ধূসরতায় বিষাদকে বরে।

 কুয়াশা ঢাকে রাতকে 
     দোলাচলের সুখ-অসুখে, 
  চাঁদ তারা ফিকে হয়
      ছোঁয়াচ পেয়ে না জানি কোন অসুখে!

 বাড়ি থেকে ঘরগুলো সরে যায় ক্রমেই 
    লক্ষ যোজন দূরে,
মানুষ আর মন ভিন্ন সত্তায় বাঁচে
   অনুভূতিগুলোকে কবরে পুরে!

শীতটা তাই করাল হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে
   এবার যাপনের পুরোভাগে,
উষ্ণতা হারিয়েছে বর্ণহীন ভালোবাসা
    জমছে ফসিল হয়ে জীবনের সব ভাগে।।







ফাঁকতাল
 
স্বা তী  ঘো ষ 

তোমার কাছে যখন নতজানু হয়েছি
তোমার বুকের মধ্যে  যখন ওম খুঁজেছি
সমস্ত অরণ্যের গান বেজেছে শাখায় শাখায় 
আমাকে বারবার বোধের আড়াল থেকে 
ফিরতি টান দিয়েছে কে,
কুয়াশার ঘেরাটোপ থেকে 
উন্মুক্ত হাওয়ায় ডাক দিয়েছে-
আমি যাইনি সে ডাকে-
ঘুমিয়ে থেকেছি অলস বিশ্বস্ততায়
আঁকড়ে থেকেছি তবু
শূণ্যতার বিন্দু বিন্দু বুদবুদ-
তালকানা আমি চিরকাল
ভুল লয়ে ভুল ছন্দে 
পা ফেলে ফেলে 
আয়ত্ত করেছি ফাঁকতাল
সম চলে গেছে ফেলে ছন্দের ধরতাই---







হিমের রাতে

দে ব যা নী  সে ন গু প্ত 

কনকনে হিমের রাতে,
শনশনে ঠান্ডা বাতাসে, 
দাঁতে দাঁত করে কনসার্ট, 
লেপ কম্বলের ভেতরে ঢুকে, 
একটু আরামে ঘুম শুয়ে,
তবুও  ঘুম নাই আসে।
হিম শীতল জলে কে করে স্নান?
কলের ঘটাং ঘটাং শব্দ, 
জলের ঝপাং ঝপাং আওয়াজ,
প্রাণ যেন কেঁপে ওঠে,
আমিই ঠান্ডায় কুপকাত।
উঠের দেখার জানলা খোলার,
জোর অবধি নেই মনে,
ভোর রাতে খেজুরি হাঁকে,
ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক।
হাতে মোজা পায়ে মোজা, 
মাথা গা মুড়িয়ে!
তবুও  শীত পায়ে, নাক গেছে জমে,
কুয়াশা ঘেরা পথঘাট একটু তখন ফর্সা।
হিমের পরশে হিমের রাত,
ভীষ্মের শরসজ্জা, ঠান্ডায় জেরবার,  
ভয় স্নানে, চটি ছাড়া মেঝে পা দিতে।
কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে সারমেয়, 
চায়ের দোকানের ছাইয়ের স্তূপে,
হিমের রাত কাটে শিশিরের বিন্দু, 
ঝরে পড়ে, ঘাসের  মাথায়,
জাগায় ভাবনা, নতুন বছর আসছে।






মেঘ বৃষ্টির কল্পনায়

শু ভা শি স  সা হু

অনিন্দিতা আমি আজও
তোমার উড়ন্ত স্বপ্নে উড়ে চলি। 
আমি তোমার 
ক্রীতদাস প্রেমিক। 

এই প্রেম এই আকাশ---
আমাকে শেখায় তোমার প্রেমের
মানে। 

তোমার প্রেমের বিক্রিয়ায়;
তোমার প্রেমের উল্কা ঝড়ে
আমি শুধু হারিয়ে যাই। 

অনিন্দিতা, তুমি আজও রয়ে গেছ
এই আকাশের উষ্ণতায়, 
আমরা শুধু
হারিয়ে যাব মেঘ বৃষ্টির কল্পনায়।







ভালোবাসার পারানি

প্র দী প  সে ন 

দৌড় আমার খুব একটা দীর্ঘ নয় 
ওই মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত গোছের
ওইটুকুন পথে যা পাবো, যাকেই পাবো
আঁকড়ে ধরতে চাই সব কিছু আর সব্বাইকে 
ক'দিনেরই বা এই অতিথি জীবন?
অপূর্ণতা রেখে চলে যেতে চাই না 
তাই বাঁধা পড়ে যেতে চাই হৃদয়ে হৃদয়ে।
প্রদীপের জ্বলন যেখানে ভাগ্যলিপি 
সেখানে আলোকে বন্দি করে কী লাভ?
ক্ষীণ আলো হয়েছে তো কী হল 
নিঃ‌শেষে সবটুকু দিয়ে যদি নিভে যাই
অনুযোগ অভিমান করবে কী করে? 
ওটুকুই আমার শেষ পারানির কড়ি হয়ে থাক।






হেমন্তের  চিঠি

শি বা নী  গু প্ত 

হেমন্তে চিঠি এলো শিশিরের  খামে
প্রেমের সুরভি মেখে ভালোবাসা নামে।
ফুলের কোমল গালে সোহাগী মায়ায়
মায়াময় ছোঁয়া যেন শীতল ছায়ায়।

টুপটাপ শিশির যে মৃদু তালে ঝরে
পাতাদের গায়ে পড়ে সোহাগেতে ভরে।
হেমন্তে  মাঠে পাকা ধানেদের শীষে,
 চাষিদের শ্রম কথা আছে সেথা মিশে।

হিম হিম শীত মেখে হেমন্ত বলে,
নবান্নে গীত গাবো আয় সবে চলে।
তরতাজা খেজুরের রসে খাবো পিঠে 
মায়ের হাতের তৈরী লাগে বড়ো মিঠে।

হলুদ সর্ষের ক্ষেতে মনোহরা শোভা
ফুলে ফুলে ধরা ভরে বড় মনলোভা।
দাঁড় বেয়ে মাঝি চলে গেয়ে নদী বুকে
কলসী কাঁখেতে লয়ে বধূ হাসি মুখে।

হেমন্তে রূপখানি দোলা দেয় মনে,
অলিদের প্রেম কথা ফুলেদের সনে।
বন বনানী সব অপরূপে সাজে
কবি মনে কাব্য কথা লেখনীতে রাজে।







অন্ন

শ্রী ধ র 

প্রান্তের মানুষ বিভিন্ন, 
সবার চাহিদায় অন্ন,
থাকতে বাঁচার জন্য। 

পুষ্টির জন্য অন্ন, 
বৃদ্ধির জন্য অন্ন, 
জীবন হোক অনন্য।

চক্রান্ত এড়িয়ে ঘৃণ্য,
সংগ্রাম চলুক ভিন্ন, 
অধিকার হোক প্রতিপন্ন।

নতুন ফসলের জন্য, 
কৃষক হয় ধন্য,
করে পালন 'নবান্ন'।






অপরূপা তিস্তা

বি কা শ  গুঁ ই

কলকল বয়ে যায় মলমল হাওয়াতে, 
আকাশের যত রং মেখে নিয়ে গায়েতে।

দুইপারে শোনা যায় কাশেদের ফিসফাস্,
ভেসে আসে কথাকলি মেঘেদের দূরভাষ।

ঘুমভাঙা সকালে সদা দেখি চঞ্চল, 
কখনও প্রশান্ত তার জলরঙা অঞ্চল।

বর্ষায় পাগলিনী শরতের মৃদুলা,
তার রূপে মজেছিল
গাঙুরের বেহুলা।

আমি থাকি জাগাচরে হাল হীন নৌকায়,
মাঝে মাঝে ভেসে যাই দিশাহীন তিস্তায়।






একমুঠো রোদ

র ঘু ন ন্দ ন  ভ ট্টা চা র্য্য

একমুঠো রোদ চেয়েছিলাম তোমার কাছে,
যার আভায় তোমার আঁচল হয়েছে সোনালি,
হিমশীতল মাঘ বারবার মেনেছে পরাজয়!

উত্তুরে হাওয়ার কামড়ে জমাট বাঁধা শিরা,
অসহায় আঙ্গুলগুলো ক্রমশ অসাড়;
আঁজলা ভরা উষ্ণতাই শুধু শেষ ভরসা!

ছেঁড়া কম্বল ঢাকা ফুটপাত চাই না দেখতে,
তবু নিজের অজান্তেই চোখ পড়ে সেখানেই—
অসহ্য কাঁপুনি গ্রাস করে আমার সত্তা!

জানি না তোমার এমন অনুভূতি হয় কি না,
হয়তো বা হয়, মুখ বুজে সহ্য করো যন্ত্রণা,
একই ভাবনা বইতেই পারে সমান্তরাল স্রোতে!

সেই ভাবনায় হেঁটে যাবো দূর থেকে দূরে—
একটু উষ্ণতা চেয়ে অচেনা ছায়াপথ পেরিয়ে,
তোমার উষ্ণতামাখা আঁচলের ছোঁয়া নিয়ে!






মায়াবী রেখা

মী না ক্ষী  চ ক্র ব র্তী  সো ম 
 
সংযোগাযোগ ছাড়িয়ে দুরন্ত মন ধাবমান
তখনো বেলা শেষের ছায়া প্রলম্বিত হয়নি। 
সালোকসংশ্লেষে তরুলতারা শীতঘুমে কাতর। 
স্বয়ংসিদ্ধা হবার মন্ত্রগুপ্তি পাঠ শেষে
কুয়াশা মেশা রাতের অলস ধুলোয় 
মিশে গেছে সব রক্তিম অনুরাগ। 
চন্দ্রাতপ বিছানো বিবশ পথে    
হৃদয়তন্ত্রী শোনায় রাধিকার কথকতা 
অপেক্ষার প্রহর হয় শেষ   
তখন যমুনায় ঢেউ উঠে তুমুল। 
নদীর মতন জলজ অথচ 
গভীর জীবনবোধে জারিত জীবনে 
আরব্ধ কাজ শেষ করার তাগিদ  
তাড়িয়ে ফেরে সকাল সাঁঝে। 

ওদিকে শান্ত জলাধারের বুকে বিম্বিত 
সিক্তবসনা মেঘবালিকা। 
একাকী জলের বুকে আঁকে 
আলোছায়ার মায়াবী রেখা।।






ফেলে আসা ফাগুন

সু দী প্তা  পা ল 

স্মৃতির মেলায় যেতে ইচ্ছে করে 
যদি কোনো চেনা মুখ চোখে পড়ে 
সাধ হয়, ফিরে যাই 
সেই বইয়ের বৈকুন্ঠে 
যদি কোনো খোলা পাতার 
খামখেয়ালি গল্প 
আমায় জড়িয়ে ধরে...







হেমন্তের নিশিকাব্য

পা র মি তা  দা স  চৌ ধু রী

হেমন্তের নিশিকথারা যখন 
বলে  ঝরাপাতার আত্মকথন,
স্তব্ধ চরাচর জাগে চাঁদের আলোয় 
জোৎস্নামাখা বসুন্ধরা হয়ে ওঠে মায়াময়।
নবীন কুয়াশা মেখে সুগন্ধি ছড়ায় ধরাতল,
সেই সুবাসে ভাসে প্রেমিক যুগল।
রাসপুর্ণিমার চাঁদ বলে প্রেমের ভবিতব্য,
বাতাসে আন্দোলিত হয় হেমন্তের নিশিকাব্য।






বর্ষার নির্মল জলে

রা ম মো হ ন  বা গ চী

শার্টের বোতাম খুলে 
ঝেড়ে ফেলো ধূলোর প্রলেপ 
শুকনো শার্টের ভিতর 
বাসা বাঁধে হাজার বানর।
খাঁচাটাকে ভালো করে ধুয়ে ফেলো 
বর্ষার নির্মল জলে,
নিজ থেকে মুছে যাবে আঁধার।
মাঝে মাঝে আমিও ভিজি 
আর চলতে থাকি নির্ভয়ে,
কালো আবরণটা বড্ড ভারি 
তাই দেখেও যায় দেখা।
নিজেকে জানতে উড়ে যায় যৌবনের বসন্ত!
তখন দেখা যাবে অমাবস্যার চাঁদ।
তুমি আত্মপ্রকাশ কর তোমার খুশিতে,
আর, আমি ও তোমার ছন্দে বিভোর, 
তাই, শার্টের বোতাম খুলে ভিজে চলি নির্ভয়ে আপন খেয়ালে,
বর্ষার নির্মল জলে।।






শ্রেষ্ঠ বিচারক

শ্যা ম ল  খাঁ 

কতবার কান পেতে শুনেছি 
বনানীর সাথে স্রোতস্বিনীর নিভৃত আলাপ
রঙ্গরসের নিরলস আদান প্রদানের মধুর রাগিণী।

কতবার দেখেছি অশ্রু বারি মুছে দিতে ছুটে আসে 
কোমল কিশলয় রুমাল,
তারপর নবীন অরুণ কিরণে সব দুঃখ বিলিয়ে দিয়ে 
কলকাকলির সাথে অবলীলায় হেসে উঠতে।

আদিম পৃথিবীর স্বয়ম্ভু যা কিছু 
মানুষের সভ্যতার অগ্রগতির ধারা আগলে রেখে
পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে,
একে একে সেই সব সৃষ্টিতে পড়ছে পাপিষ্ঠ হাত।

নদী তার কান্না বুকে নিয়ে হারালো গতিপথ
অরণ্য হারালো তার আদরের মহীরুহ
পাহাড় হারালো অসীম ধৈর্য্য,
শান্ত সমুদ্র হলো অস্থির, অশান্ত
তুলাদণ্ডের স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হলো বার বার ।

মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে 
মেকি সভ্যতার অস্থায়ী জৌলুসের তীব্র আকর্ষণে,
নেশাগ্রস্ত মানুষের জ্ঞানশূন্য পদক্ষেপে 
মাতাল হচ্ছে আকাশ বাতাস নদ নদী 
পাহাড় পর্বত আর অরণ্য মৃত্তিকা।

দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া প্রকৃতি 
তোমার আমার মতো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে 
পাল্টা জবাব তো দেবেই একদিন।

নিজের কবর খোঁড়ায় ব্যস্ত মানুষের দল
প্রকৃতির মারে চিরদিন অসহায়।
এখানে কোনো আইন নেই , আদালত নেই 
ঘুষখোর বিচারক নেই।
প্রকৃতি নিজেই সুদক্ষ বিচারক 
পায়ে ঘুঙুর, হাতে ত্রিশূল আর ডমরু 
গলায় রণ হুংকার
চোখে প্রতিশোধের দুরন্ত আগুন।
সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নটরাজরূপী 
এই প্রকৃতিই যেন শ্রেষ্ঠ বিচারক।





আমরণ, মনোহরণ

হে ম ন্ত  স র খে ল

আজকাল আর কাঁদি না। 
আবেগী হলে, কাঁধের উঁচু কালো মাংসের দলাটায়
অনবধানে চলে যায় হাত।
কানের পর্দা সহ্য করে অতীত শিলাবৃষ্টি-
—এগিয়ে চলো, সাব্বাস!

আজকাল আর পতাকা বইতে হয় না।
মে দিবসেও না। কাঁধের বিশ্রামী দিন এখন। পায়েরও।
রাত করে ফিরতে হয় না ঘরে
চাল, ডাল, নুনের চিন্তায় থাকে না মাথা ধরে।
পাকা ঘর, ছাদ, বাল্বের আলো, মোবাইল— সাম্রাজ্যে মৌজ হী মৌজ।
অনিশ্চয়, কেউ নেবেই নেবে খোঁজ। 
কলুটোলা ডাকে না জোরে জোরে— মনোহরণ... ঠিক সাড়ে চারটে... টালিখোলার মাঠে...
খেলা এবার আরও কঠিন, কাঠে কাঠে...

রেশনের চাল ভালো। হোক্ না প্যাকেট দুধ! লভ্য সহজেই।
কেন তবে সমুদ্রেরা উপচে আসে চোখে!
কেন মন চায়—
আবার লাগাই একটা ভীষণ দৌঁড়
রগড়া খেতে থাক পতাকার কালো ডান্ডা
আবার কাঁধটা জ্বলতে থাক,
চোয়াল অদম্য পতাকাকে হাওয়ায় ভাসাক...

শূন্য মাঠে শোয়া হয় না কতদিন
শামু'র বিড়ি ভাগ করে নেওয়া পড়ে না আর মনে।
যখন গম কেটে ফিরতো রাসের বৌ, আহ্বান রইতো চোখের কোণে।
একেকটা রাতের যৌবন কতবার এনেছে নাগসম্ভোগ, ছলাৎ প্রেম শরীরে, মেনে নিয়েইছিল লোক।
এসব স্ববচন! তোমার জন্য নয়
মনোহরণ—
সবকিছুরই দিন যে পাল্টে যায়!

বিশ্বাসটুকু ধরে বেঁচে থাকা
গতি কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে সব।
আর প্রয়োজন নেই পতাকা
অদরকারি মেয়াদি কলরব। 
শুধু মনে রাখি, বওয়ার মতো
কাঁধটা এখনও আছে 
মনোহরণ এখনও বেঁচে, নিজের কাছে।






আঁধারের কৃষ্ণ

র বী ন্দ্র না থ  প্র ধা ন 

বাইরে যাওয়ার অধিকার নেই তোমার,
তুমি কয়েদখানায়।

আলোর দাবি তাই করে কী লাভ?
বরং আঁধারের সাথে মিত্রতা হোক।

সেই মিত্রতাকে পুঁজি করে
আবৃত্তি করো কবিতা,
গেয়ে ওঠো সাম্যের গান,
মন মাতানো পল্লীগীতি।

ধীরে ধীরে,
আঁধারের কালো পাথর কেটে কেটে
রামকিঙ্করের মতো গড়ে তোলো কৃষ্ণ—
যার শরীর থেকে ঝরে পড়বে আলো।

তোমার জেদ, তোমার ভালোবাসা—
মন্থন করুক এই আঁধার,
তুলে আনুক এক নতুন আলোর সকাল।






নিভে যাক যত আলো

প ল্ল ব  ভ ট্টা চা র্য  অ ন ন্ত 

নিভে যাক কৃত্রিম যত আলো
অন্ধকার আকাশের বুকে জেগে থাকুক 
মহাজাগতিক হাজার নক্ষত্ররা--।
নাহয় বারবার মুছে নেব আতশ কাঁচ
অন্ধকারে মিশে আমিও নাহয় 
নিমগ্ন হয়ে মেখে নেব পৃথিবীর অন্ধকার।
না দেখা অবশিষ্ট নীলটুকু রয়ে যাক
আকাশের অদৃশ্য পারে চিরকালের তরে।
আরো--- আরো দীর্ঘস্থায়ী হোক আলোকহীনতা 
প্রয়োজনে মোমবাতি জ্বেলে দেখে নেব
তোমার বেজার  মুখের অজস্র বলিরেখা।
চাইনা দেখতে বাহান্ন তীর্থের গর্ভগৃহ
নাহয় হাতড়ে হাতড়ে ছুঁয়ে নেব দেওয়াল 
কালো চন্দনে রেখে যাব অস্তিত্বের ছাপ
আর গুনে গুনে মেপে নেব উন্নতির অভিশাপ।







তুমি আমায় ভুলেছো

সং ঘ মি ত্রা  ভ ট্টা চা র্য

তুমি আমায় ভুলেছো,
খোঁজ নিয়ে দেখলাম এই হেমন্ত সন্ধ্যায়...
ভুলে যাওয়ার দিন মাস বছর যোগ করে,
ঠিক এক দশক পার হলো। 
তবুও শীত এলে সেই গ্রামের আলপথ,
উঁচু  নিচু  কাঁচা পথ,
বাড়ির মাটির দাওয়া,
তার পাশে পুকুর ঘাট,
যেখানে শীতের তরুণ রোদের মধ্যে চায়ের প্রথম চুমুক দিতে দিতে কত পরিযায়ী পাখিদের দেখতাম।
তারপর সন্ধ্যে নামার মুখে খামার বাড়ির ধানের গন্ধের রেশ নিয়ে দূরে ক্ষেতের সীমানায়, যেখানে আকাশ দিগন্তরেখায় মিশেছে সেখানে কমলা টিপের মতো সূর্যাস্তের মায়াবী রূপ।
তারপর শীতের আদর মাখানো মাটির মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে গল্পের আসর,
সব সব এসে আমার শহুরে রাতে একলা ঘরে স্মৃতির ডালি উপুড় করে!
এতো  বড়ো পৃথিবী,
সেখানে রোজের নিয়মে কত সুখ দুঃখ বিরহ শোক,
জানি ব্যস্ত শহর খবর রাখে না কিছুই।
তবুও আমি না চাইলেও যখন তারা তোমার খবর জিজ্ঞেস করে,
তখন খুব খুব  অসহায় লাগে।
ওদের বোঝাতে পারিনা যে চলে যায় সে কোনো ঠিকানা রাখে না।
জীবনের  হঠাৎ ফুরিয়ে যাওয়া অধ্যায়টা এমনি করেই অপূর্ণ থেকে যায়।
ভাবি, বেশ সপ্তাহ দুয়েকের সাজানো গোছানো সংসার ছিল আমাদের।
হ্যাজাকের আলোয় বেশি দেখতাম যা এখন হাজার ওয়াটের আলো আবছা দেখায়।
একটা অপার্থিব সুখ ছুঁয়ে যেত মাটির দেওয়াল থেকে সর্বত্র।
দুদিনের খেলাঘর বেঁধেছিলাম আমরা।
আর মনে পড়ে সেই যে কুমারী মেয়েটা
হাতে চুড়ি কপালে সিঁদুর পরে ঘোমটার আড়াল থেকে,
পৃথিবীটা দেখতো। তার ঘোমটা খুলে নিয়েছে সমাজ।
তার লজ্জাবস্ত্র, তার অকালে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো,
রোজ হলদে  হওয়া পাতাদের ভিড়ে মিশে যায়।
তবুও কনকনে উত্তরে হাওয়া যখন শরীরে শীতল স্পর্শ রেখে যায়,
তখন ভেতর থেকে কে যেন বলে চলে,
তুমি ভুলেছো ঠিক এক দশক হলো।
কিন্তু আমি ভুলতে পারলাম কোথায়?






জানতে হবে একদিন

সু মা  গো স্বা মী 

একপা দুপা করে রোদ নেমে এসেছে পৃথিবীর উঠোনে আমরা হাঁটছি , হাঁটছি আর হাঁটছি 
          নেই কোনো বিরাম।

নদীতে তখন হাওয়ার মাতন,
   নৌকার মাঝি দাঁড় সামলে চলেছে,
  আদুরী মাছেদের সমবেত সংগীত 
নৌকোর খোল বেয়ে নদীর জলে কাঁপন ধরায়।

দিনশেষে বাড়ি ফেরার পথে 
বউ দুটো করে চলেছে মনের আদান-প্রদান।
আবারো তো ঢুকবে খোপ কাঁটা সেই রান্নাঘরে 
ঘাম ঝরিয়ে তৈরি করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

কচুরিপানার মস্ত আনন্দ 
 অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছে জন্ম থেকেই,
কত শত জনপদের খবর রয়েছে ওর কাছে।

নদীর জলে ঢেউ ওঠে,
খল খল হাসিতে এঘাট ওঘাট ছুঁয়ে চলে যায় 
ভুলো কুকুরের পচা গলা দেহের নির্যাস।

মন্দিরে আরতিধ্বনি 
প্রদীপ শিখার তিরিতিরি কাঁপন,
পবিত্র একটা সময়ে গাঁয়ের জ্বালা জুড়ানো সুখ
 একপা দুপা করে নদীর পাড়ে নিঃশ্বাস ফেলে।

কখনো ভাঙা কখনো গড়া
অবিরাম উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে চলছে 
ইতিহাসের পাতা।

হাত ধরাধরি, টানাহেঁচড়া 
জীবনের রঙে কতো কতো রঙিন ক্যানভাস,
 তুলিটা কি ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের দেশের সঙ্গী হতে চায়!
জানতে হবে একদিন।






আমি কে?

বি দ্যু ৎ  চ ক্র ব র্তী

ভেঙে গিয়েছিল আয়নার কাচ
কখন, কী করে তা জানা ছিল না
জেনেছি যখন, দেখেছি যখন নিজেকে—
চমকে উঠেছি। এ কার মুখ?

এতদিন অন্যের চোখে কিংবা মুখের কথায়
কিংবা আয়নায় দেখেছি নিজেকে
সন্দেহ জাগে মনে— এই কি তবে আমি?
দেখি আর ভাবি, ভেঙে পড়া আমি কি এমনই?

জীবনের চৌদ্দআনা পেরিয়েও নিজেকে
চেনা হল না আজও— এই অমোঘ সত্য
কার কাছে লুকোই? জীবনের পথে…
মন্দ-ভালোর দ্বন্দ্বে আমি বেসামাল চিরদিন।

ছাই হয়ে যাওয়ার আগে কেউ কি
দাঁড়াবে এসে সামনে? বলবে কি কথা
সত্যবচনে, নির্ঘোষ বয়ানে…
আমি কে, আর কেন এই পৃথিবীতে?





শীত আর আমার শহর

অ ন্ত রা  ম ন্ড ল

শীত আমার শহরের পিঠে পিঠ রেখে বসে থাকে দুটো মাস
রাস্তার দোকানে চা খায়, মাঝেমধ্যে তর্ক করে,
শীত আমার শহরের বুকে গড়ে দেয় প্রেমের স্থাপত্য,
হিমেল হওয়ায় ছড়িয়ে দেয় শিশিরভেজা স্বরলিপি,
নিঃসঙ্গ ল্যাম্পপোস্টের নীচে লেখে কাঁথায় মোড়া গল্প,
শুষ্ক পাতা ঝরে পড়ে খরস্রোতা হয়ে,
পরিযায়ী পাখির দল পথের বুকে রেখে যায় ব্যাকুল চুম্বন,
শীতের আলিঙ্গনগুলো অনেকটা মরীচিকার মতো—
ছোঁয়া যায় না।
তারপর নিমেষেই হারিয়ে যায় দূরে—
সীমানা পেরিয়ে বাসা বাঁধে অন্য কোনো দ্বীপে,
ডিসেম্বরের ম্রিয়মান শীতের সন্ধ্যায় গল্পগুলো বদলে যায়
কাঙাল শহরের পাঁজরে জমে অজস্র চিৎকার।
অবশেষে শহরটা কি পায়?
ক্ষয়, ক্ষতি, অপচয় আর সেই অনাকাঙ্ক্ষিত অবহেলা।






বিমর্ষতা

র ঞ্জি তা  চ ক্র ব র্তী

শুনেছি তোমাদের দেশে
আনন্দের কবিতা লেখা হয়।
ঠিক কতটা খুশি কিনতে পারলে,
জীবনে সুখী হওয়া যায়,
তা আমি জানিনা!

তবে, আমার খাতায় অনেক গল্প আছে—
না না, শৌখিন সুখের গল্প নয়...
দ্রৌপদী, শকুন্তলার গল্প।





একটা নিজের মানুষ চাই

সু স্মি তা  দা স

কেউ কেউ চায়, জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে আমি তোমাকে ভালবাসি।
  আর কেউ বলতে গিয়ে না বলার আক্ষেপ নিয়ে কাটায় এক জীবন।
  মানুষ মূলত কাউকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়,
   একটু ভরষা চায়,
একটা বিশ্বস্ত হাত চায়;
  সর্বপরি একটা বিশ্বস্ত সঙ্গী চায়।
  কেউ কেউ পেয়ে গিয়ে পূর্ণতা পায়,
    আবার কেউ কেউ দূরে থেকে ভালোবেসে আজীবন কাটায়।





পদ্মজন্ম

দী প্র  দা স চৌ ধু রী

যেভাবে রাস্তায় লোকে স্নান করে—
ধুয়ে নেয় কলের জলে সুগন্ধী শরীর।
সেভাবে পদ্মজন্ম নিও
রেখে যেও জলাশয়ে নিজের যাপনচিহ্ন...

পাতায় উন্মুক্ত শিশিরের কোল ঘেঁষে
জন্ম দিও নিভৃত অন্তরার,
কলির ছোঁয়ায় রেখো সন্তাপের বাণী—
ভালবেসো অবিরাম মনের অসুখে।






টেলিফোন
  
সা র দা  চ ক্র ব র্তী

সেদিন ছাদের কোণে,
আমায় সে শুধোয় ফোনে,
হারিয়ে যদি যায়,
আমি আপন মননে 
তবে খুঁজে পাবে সে আমায় কোন স্বপনে?
প্রতুত্তর দিলাম আমি,
কোথায় আবার খুঁজবে আমায়,
বরং খুঁজে দেখো,
তোমার সুখ স্মৃতির পাতায়।
কিংবা পেতেই পারো আমার ঠিকানা,
মেঘের পালকে চাঁদের আলোতে।
না গো এসবই ছলনা,
তবে আজ গোপনে বলছি তোমায়,
আমার সঠিক ঠিকানা।
মনে করে দেখো,
সেদিন আমিই লিখে এসেছিলাম, 
আমার স্থায়ী ঠিকানা তোমার 
বাঁ বাহুর শিরায়।






শীতের চাদর

বী থি কা  ভ ট্টা চা র্য

কুয়াশা চাদরে মুড়ে আলটুসী রোদ, আর শীতের সকাল,
আড়মোড়া ভেঙ্গে রোজ সূর্য্যটা ওঠে, ছিঁড়ে কুয়াশার জাল। 
হিমেল শীতের ভোরে, টুপটাপ ঝরে পরে, শিশিরের ফোঁটা,
কনকনে ঠান্ডায়, ওম মাখা লেপ ছেড়ে, গুটিসুটি ওঠা। 
সারাদিন হুটোপুটি, দুষ্টুমি খুনসুটি, শালিকের দল। 
ফুলের নতুন কুঁড়ি, শিশিরের ছোঁয়া পেয়ে, খুশি টলমল। 
টিনের চালের ঘরে, টুপটাপ ঝরে পড়ে, শব্দে জড়ায়। 
জানলার শার্সিতে, মনের আরশী ঘরে, টোকা দিয়ে যায়।  
টুপটাপ ঝরে পড়া, পাতাদের নিক্কণ, পৌষালী ভোরে। 
পদ্ম পাতার পরে, শিশিরের ফোঁটা জল, টলমল করে। 
শিল্পীর তুলিতে, কত রূপে কত রঙে, আঁকা আল্পনা।
তালে, সুরে বারে বারে, কবির কলম জুড়ে, শত কল্পনা।
ঘাসের ডগার পরে, জলের বিন্দু যেন, মোতি পান্নায়। 
শব্দ‌রা ভীড় করে, বিরহী মনের ঘরে, ঝরা কান্নায়।
ঘুম ভেঙে রোজ ভোরে, ইস্কুলে ছুট মারে, কচিকাঁচারা,
ঠুনঠান, টুপটাপ, শব্দ কুড়িয়ে পথে, ছুটে  যায়  ওরা। 
চারিদিকে ধোঁয়া ধোঁয়া, কুয়াশা চাদরে ছাওয়া, আধো আবছায়, 
খেজুর রসের হাঁড়ি, কাঁধে নিয়ে বাড়ী বাড়ী, গাছি হেঁকে যায়,
আবেশে বিভোর আঁখি, পৌষালী শীত মাখি, উষ্ণতা চায়। 
কনকনে ঠান্ডাতে, আগুন পোহানো তাতে, প্রাণের ছোঁয়ায়। 
উষ্ণ সোহাগ মাখে, হিমেল পরশ ঢাকে, শীতের চাদর 
কল্পমায়ায় ভরা, শব্দর ঝরে পড়া, আবেগী আদর।






একদিন হঠাৎ

নী লা ঞ্জ না  ভৌ মি ক

আবার বহুদিন পরে
একদিন হঠাৎ,
দেখা হয়ে গিয়েছিল
তোমার সঙ্গে।
সেই চিরচেনা পথ ধরে,
হেঁটে এসেছিলে তুমি—
সায়াহ্ণের রক্তিম অবকাশে,
বকুল ঝরেছিল আবার—
টুপ টুপ করে---
উঠেছিল চাঁদ সান্ধ্য আকাশে
একরাশ পাতার পিছনে।
ঘরে ফিরে এসেছিল ক্লান্ত পথিক
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে
দেখেছিল সে---
আঁধার ঘরে মোমের আলোর মত
তার প্রিয়ার অধরে,
উষ্ণতার আহ্বান!
চোখে তার কুলভাঙা
ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস!
জ্যোৎস্না হয়ে মিশে গিয়েছিল
তার শ্বেতবিন্দু ঝরা শরীরে।
ধীরে ধীরে নেমেছিল
সুদূরের বনান্তিকায়
রাতের নীরব বিষণ্ণতা।

'কেমন আছো?' তীক্ষ্ম সহাস্য প্রশ্নে
 দ্রুত সচকিত আমি ,
ফিরে দেখি তুমি!!
পৃথিবীর সব রঙ মুছে দেওয়া
সুরহীন বিবর্ণ জীবনের
এক বিমূর্ত হতাশা।
কোন এক আদিম রোমান্টিকতায়
ভরে উঠেছে তোমার দুচোখ!

স্তব্ধ সেদিন বিষণ্ণ কোকিল
স্পন্দনহীন রাতের আকাশ
মেঠোপথে পাণ্ডুর চাঁদের ছায়া
সন্ধ্যায় কাক হায়! ঘরে ফেরে নাই।
হৃদয় আমার দেহ ছিঁড়ে উড়ে গেল
ঐ দূর— দূর নীলিমায়---অনন্তের দেশে।

'কোনটা শুনলে খুশি হও,
  ভালো না খারাপ?'
 এবার চমকানোর পালা তোমার!
 তোমার মুখে তখন সোনালি বকের ডানায়
 ভর করে নেমে আসা নীল অন্ধকার।
 কণ্ঠ ভিজে ওঠে ধ্বস নামা পাহাড়ের—
                 চাপা কান্নায়।
'কেন ? তোমার নিজের কথা বলো'
আমার চোখে তখন ধূসর অতীতে 
রক্তঝরা ব্যথার ইতিহাস।
রূপকথার রাজ্যে মেতে ওঠে দাবানল—
বিদ্রুপ কটাক্ষ করল অনাবিল স্নিগ্ধতাকে!
নরম স্বরে জাগল বিক্ষুব্ধ আলোড়ন—
'আমার ন্যায় কি তোমার ন্যায়?
আমার প্রেম তোমার এক তুচ্ছ ঘটনা'
'আমার সারাজীবনের আদর্শ
 তোমার মুহূর্তকালের রসিকতা!'
'থাম!' সজোরে নিক্ষেপ করলে তোমার বাণ
'কি বলতে চাও তুমি?'
 ফিকে হয়ে এল নিশার আঁধার
আগামী ভোরের তৃষ্ণায় তখন
  সকরুণ মিনতি---
"হৃদয় খুঁড়ে জাগিও না আর
  বেদনা জাগানো ভালোবাসা।"






অধিবাস

সু পা য় ণ  দা স

এই শহরে অধিবাসের রাত কাটাতে এসেছি,
ঠিকানা আমার এই শহর নয়।

সব সুখ আমি গুছিয়ে রেখেছি,
সব দুঃখকে জানাই আলবিদা।

আমার বক্ষে ছাপ পড়ুক দু’টি তাঁর চরণযুগল।
ঠিকানা আমার এই শহর নয়।

এই শহরে আমি পূজিত নই,
এখানে আমার অধিবাসের রাত কাটে।





হাভাতেদের কষ্ট ভারি

নূ পু র  রা য়

আঁধার শেষে আলোর পথে 
আকাশে দেয় উঁকি 
রাত্রি কাটে খোলা চোখে'ই
বাড়ে জীবন ঝুঁকি।

শীত সকালে শিরশিরানি 
জড়িয়ে আলোয়ান
বৃষ্টি ভেজা শরৎ এলে 
শালুক আনে বান।

হৈমন্তীর সোনার সাজ
সোনালী ধান মাঠে
মহানন্দে চাষী তুলছে 
বোঝাই গাড়ি ঘাটে।

নবান্নের ঘ্রাণে পাগল 
বাড়ির ছেলে বুড়ো 
নলেন গুড়ে পায়েস খেয়ে 
নাচে জীবন খুড়ো।

হেমন্তের বিদায় কালে
শীতের আগমন 
শীতকালেতে খাওয়া জমে
দেদার আয়োজন।

শাক সবজি পিঠে পুলিও 
সতেজ তরতাজা 
কড়াই শুঁটি কচুরি চপ
হরেক তেলেভাজা।

মজায় মজা আলালের তো
আছে সে সম্বল।
হাভাতে দের কষ্ট ভারি 
নেই যে কম্বল!






শৈত্য প্রবাহ

ধী রে ন্দ্র না থ  চৌ ধু রী

শীত এসেছে, শীত এসেছে, চারদিকে হইচই,
শীতের সুযোগ নিয়ে রে হায়, "নেপোয় মারে দই"।

তিনশো টাকার গরম পোষাক  বেচছে ডাবল দামে,
পুরোনো মাল দিচ্ছে বেচে, বিদেশী মালের নামে।

তোর আর আমার কি আসে যায়, শীত পালায় পলকে,
যখন আমায় জড়িয়ে ধরিস, আমি জড়াই তোকে।

ফুটপাতে সব কাঁপছে শুয়ে ঘরছাড়াদের দল,
কেউ দেয় না সোয়েটার বা একখানা কম্বল।

আমরা বলি শীত মানে তো মাংস, পোলাও, পিঠে,
ফুটপাথের তো শীত আলাদা, মেজাজটা খিটখিটে।

মাথায়, গায়ে পড়েনা তেল, খিচুড়ি দুর অস্ত,
উচ্ছিষ্ট যেটুকু পায়, তাই গেলে সমস্ত।

চামড়া তো শুকিয়ে গেছে, দেহ ধুলোয় ঢাকা,
আমরা ফুলকপি, মাংস, খাই কৎবেল মাখা।

ওদের তো রোজ স্নানই বারণ, পরবে পরে কি,
স্নানের পরেই উঠবে কেঁপে, হু হু, হি হি।

আমরা যখন লেপের তলায়, করছি খুনসুঁটি,
কাঁপছে ওরা ফুটপাতেতে, নেই কম্বল, রুটি।

আমাদের যে শীতের পোষাক, পরিত্যাজ্য আছে,
সেগুলো কি দিই কখনও, যায় কি ওদের কাছে?

আমি আর তুই লেপের তলায় খুঁজছি উষ্ণতা,
ওদের হাড় কাঁপানো শীতে হারিয়ে গেছে কথা।

তোর আর আমার চুলোয় যাক প্রেম, ফুটপাতে চল নামি,
গরম পোশাক যেটুকু আছে দিই দিয়ে অনামী।

সৃষ্টিকর্তা দেখুক চেয়ে,  ওদের ও কেউ আছে,
দিচ্ছে যারা গরম পোশাক, যাতে তারা বাঁচে।






দৃশ্যপট

শা শ্ব ত  ভ ট্টা চা র্য

দক্ষিণের জানালা দিয়ে সামনে তাকালে অনেকটা সবুজ দেখি,

হকারের শেষ মাইকটা কানে এলে সূর্য জবুথুবু হয়  
বাড়ির তুলসী তলায় আলো জ্বলে ওঠে,
জুবুথুবু শীতটা হকারের পেটে খোঁচা দিয়ে স্বাধীনতা জানায়॥

জানালার পর্দার ওই...পারে
 একটা মাঠ আছে 
দুটো বাছুর, শিং এর ব্যথা মেটাচ্ছে 

দেখছি; দুর থেকে,  
অনেকক্ষন ধরেই দেখেছি 
সাদা গরুটাকে আমি নাম দিয়েছি বরফ 
আর কালো গরুটাকে নাম দিয়েছি জীবন 
জীবনের সাথে বরফ মেলেনা 
তবুও তারা একসাথেই থাকে 

ওরা আমাদের প্রতিনিধি॥





নগ্ন সুরের বাগানে নির্ভার আউল

অ সী ম  দা স 

জাগালেই যখন, আলুলায়িত করো আশ্চর্য চকোরী ভাস্কর্য 
ভার্জিন জ্যোৎস্নার চুম্বন পান করে পরিশুদ্ধ হই ।
দুঃসহ সময়ের শ্বাস গিলে অলস যাপন খোলসে
ভ্রান্ত জাগরণের নামে ক্লান্ত ঘুমের বলি চড়িয়েই তো ছিলাম!

ইতিমধ্যে আমারই আয়ুর তালু ভেদ করে 
বয়ে গেছে সারিসারি সুপক্ক সুখের আলো রেখা।
পিছিয়ে পড়েছি আমি, চারিপাশে অতীত ফলক।
এখনও যারা বৌদ্ধিক আঁধারে সাঁতার কেটে 
এগিয়ে চলেছো আগামীর চৈতন্যযানের দিকে 
আমাকে যোগ্য করো চলমান যজ্ঞ ঢেউয়ের।

শুধু অর্বাচীন পেঁচা আর বাদুড়ের অনুষঙ্গে নয় 
বদ্রী পাখির ডাকে উড়ুক হৃদয়ে সাদা কাক।
নগ্ন সুরের বাগানে নির্ভার আউল আনন্দে 
আমি একান্তে দুর্বার আগের 'আমি'কে 
একবার ঝরঝরে ফিরে পেতে চাই।





বেঁচে থাকার গান

পূ জা  গু প্ত

আমার ছাদের টবগুলো 
জল পায়নি বহুদিন।
মাটি আঁকড়ে রেখেছে শিকড়
হাল ছাড়েনি কোনোদিন।

মাঝ গঙ্গায় নৌকো ভিড়েছে,
স্রোতের অনুকূলে হাঁটিনি কভু
তুফান এলো দমকা হাওয়ায়,
মাঝি পাল তোলেনি এখনও।

মেঘের তো ঘর নেই কোনো,
অস্থায়ীটুকুই স্থায়ীত্ব।
জড়িয়ে নিয়ে কেউ বলে না,
থেকে যাও, ঘুচবে দূরত্ব।

ছোটো গল্প লিখতে বসে,
উপন্যাস লিখে ফেলেছি।
উপন্যাসের শেষ পাতায়,
মেঘের ছবি এঁকেছি।

সূচিপত্রে মেঘ থেকে গেছে,
রোদ লেপ্টে ছিল মলাটে।
উপসংহার মুছেছে চিরতরে,
ভালোবাসার অবিচ্ছিন্ন পাঁজরে।

কপাল বেয়ে গা ভিজিয়ে,
ঠোঁটে তৃষ্ণা জাগে।
মেঘাচ্ছন্ন অঙ্গ বুঝি
উল্লাসে আজ মাতে।

বৃষ্টি ফোঁটা বারিধারা 
অশ্রু ঝরায় শ্রাবণ।
রোদের সাথে লুকোচুরি খেলা
মেঘমল্লার প্লাবন।

রোদ্দুরও আজ বৃষ্টি মেখে,
শান্ত স্নিগ্ধ হয়।
হারিয়ে গেছে সহস্র কত
জীবনমুখী গান।

তোমায় দেখেই মুগ্ধ হই,
তুমি কি আমার কবি?
ঝরে যাওয়া জীর্ণ পাতায়,
তুলছে কে রিনিঝিনি?





এভাবেই বাঁচব

ম ধু মি তা  ধ র

আমার আশাবাদী মন
রাতের অন্ধকারকে দু'হাতে হনন করে ছিনিয়ে আনে একটা আনকোরা সূর্যের সকাল।
বিধবার শূন্য  সিঁথির বিষন্নতায় আমি কপালে এঁকে দিই গোধূলির রক্তাক্ত তিলক...

যে নদী খরস্রোতা নয়
তাকে আমি স্রোতস্বিনী বলি না তো আর
শীত ঘুম ভাঙিয়ে আমি তার
জলোচ্ছ্বাস নাম দেব।

সবুজ থেকে ধূসর— এই গতিচক্রের অনিবার্যতার কাছে আমি নতজানু হয়ে সবুজ ভিক্ষা করি।

আমার শিকড়ের জলে জন্ম দিতে চাই  এক আকীর্ণ বর্ষা।
তুফানে টিকে থাকা বনস্পতির  মত বিস্তারিত হই—
যন্ত্রণায় জ্বলে যাওয়া কীটদষ্ট শাখায় আন্দোলিত করি বাতাস।
উৎসবের জলসায়, জংলা নদীর তীরে, বেদনার বালুচরে এক রঙীন প্রজাপতির মত ছড়িয়ে দিই
ডানার স্বাধীনতা।

যে মৃত্যুকে মেরেছে বারবার
জীবনের উদ্যত খড়্গের বর্ণিল কষাঘাতে—
তাকে আমি সঁপে দিয়ে যাব
আশাবাদী যৌবনের বেহিসাবী সুখ।
পৃথিবীর  সব প্রণাম কুঁড়িয়ে এনে রেখে দেব তার দু'টি পায়ে...






রোজনামচার প্রতিদিন

জ য়ী তা  চ ক্র ব র্তী  আ চা র্য

দিনগুলো কতই না নিরিবিলি ভাবে
নিজেদের গল্প লিখে যায়—
আমার টেবিলের কোণে রাখা একখানা ডায়েরি
প্রতিদিনই অপেক্ষায় থাকে
কিছু শব্দ, কিছু নিশ্বাস,
অল্প কিছু কষ্ট আর সামান্য হাসির জন্য।

ভোর হলে প্রথম আলো এসে
পাতার ওপর ফেলে যায় সোনালি রেখা,
আমি লিখে রাখি—
আজও বেঁচে উঠলাম একটু,
আজও মনে পড়ল কারো নাম।

চা বানাতে বানাতে
মনে হয়, দিনের শুরুগুলোর মধ্যেও
এক একটা নিজস্ব ঘ্রাণ আছে—
যা শুধু আমি বুঝি,
আর আমার নীরব কথামালা।
দুপুরে ব্যস্ততার ভিড়ে
শরীর ক্লান্ত হয়,
কিন্তু লেখার সময়
মন যেন কোথাও পালিয়ে যায়—
গোলাপের বাগানে, বা অসমাপ্ত স্বপ্নে।

সন্ধ্যে নেমে এলে
আলোরা ঘরে ফিরে আসে,
আমি লিখে রাখি—
আজও কারো অভাব খুব মনে পড়ল,
তবু হাঁটলাম ঠিক মতো পথ ধরে।

রাতের শেষে
ডায়েরি বন্ধ করার আগে
একটা কথাই মনে হয়—
রোজনামচার প্রতিদিন আসলে
আমার নিজের সঙ্গে পুনর্মিলন,
যেখানে আমি আমার সত্যিকারের আমাকে
আবার খুঁজে পাই নীরবতায়।






ভালোবাসা
  
শ মি তা  ভ ট্টা চা র্য 

তোমায় দেখেছি
নিরালায় চিলেকোঠায় 
জানালার বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি
হৃদয়ের পথে হেঁটে যাও তুমি
সেখানেই প্রথম বোধহয়
তোমায় আমি দেখেছি।

তারপর বহুকাল
আঁধারের সহবাস
একদিন বৃষ্টিশেষে হেসে
কৃষ্ণচূড়ার গাছের নীচে 
বৃষ্টির আধ-ছোঁয়া জল
পড়েছিল অনাবৃত মুখের উপর
স্পর্শের কাঙাল মন
সেখানেই আবার
তোমায় আমি দেখেছি।

দেখেছি হেমন্তের সোনারোদ ছুঁয়ে যাওয়া
ধানের শীষের কাছে
দাঁড়িয়েছিলে একা 
ঠিক আমারই মত!

কতবার ভেবেছি ডেকে বলি
কেউ কি নেই তোমার সাথে?
আনমনে পথচলে তুমি কি আমায়
ওগো দেখেছিলে?
আমি যেমন দেখেছি তোমায়।





এই শীতে

সো মা  দ ত্ত

এই শহরে শীত এলেই একাকীত্ব ডানা মেলে উড়ে যায়
বন্ধুরা একে একে জড় হয়
যেন এক ঝাঁক পরিযায়ী পাখি
কোনও এক রবিবার গঙ্গার ধারে পিকনিক
শহরের গাল ছুঁয়ে ঝলমলে মেলা
সাজানো গোছানো হরেকরকম পসরা
দুপুরের আদুরে গোলাপি রোদ
সকালের উত্তুরে বাতাস
বিকেলের ক্লান্ত, এলোমেলো ধুলোরা
রাতের কুয়াশা জড়ানো রাস্তার আলো
শরীরে এক অদ্ভুত নেশা জাগায়
আমি ভাতঘুম এড়িয়ে চোখ মেলে বসে থাকি
জানি, কেউ না কেউ আসবে
আমার সব অলসতাকে ছারখার করে দেবে
একঘেয়ে দিনযাপন শেষ হবে
ওরা কেউ আমায় একা থাকতে দেবে না
কোনও অজুহাত শুনবে না
হুটপাট সব গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে পাহাড়ের ডাকে।






নির্বাক পুরুষ

দে ব যা নী  ঘো ষা ল

সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ সে নয়,
যে অন্যায় করে—
ভয়ংকর সে,
যে অন্যায় দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
বাসের ভিড়ে এক মেয়ের চোখে জমে ওঠে আতঙ্ক,
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকে বহু শিক্ষিত মুখ—
কেউ জানালার বাইরে তাকায়,
কেউ মোবাইলের পর্দায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে,
কেউ মনে মনে ভাবে—
“ঝামেলায় জড়িয়ে লাভ কী!”
এই নীরবতারও শব্দ আছে—
তা থাপ্পড়ের চেয়েও জোরে বাজে,
অপমানের চেয়েও গভীর ক্ষত রাখে।
যে প্রতিবাদ করতে পারত,
সে চুপ থাকে নিজের নিরাপত্তার জন্য।
যে হাত বাড়াতে পারত,
সে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
যে সত্যিটা বলতে পারত,
সে সম্পর্ক বাঁচায়, সম্মান বাঁচায়, চাকরি বাঁচায়—
শুধু মানুষটাকে বাঁচায় না।
সমাজ আসলে একদিনে অসুস্থ হয় না,
প্রতিদিন একটু একটু করে
আমাদের সুবিধাবাদী নীরবতায়
তার জ্বর বাড়ে।
অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো যেমন অপরাধ,
অন্যায়ের সামনে চুপ করে থাকাও তেমনই।
কারণ, অপরাধী একা জন্মায় না—
তাকে তৈরি করে
শত শত নির্বাক ভদ্রলোক।
সুস্থ পৃথিবী চাইলে
প্রথমে ভাঙতে হবে এই ভদ্র নীরবতা—
প্রতিবাদ কখনও অশান্তি নয়,
প্রতিবাদই
মানুষ হয়ে থাকার শেষ প্রমাণ।






শিষ্টাচার

উ প মা  বে গ ম

শিষ্টাচার আজকাল অনেকের চোখে দুর্বলতার আরেক নাম।
তুমি মাথা নত করলে তারা ভাবে, তোমাকে আরও নিচু করা যায়।
তুমি সম্মান দিলে তারা তাকে অধিকার ভেবে বসে।
ভদ্রতা যেন এক অদৃশ্য সিঁড়ি, যেখানে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ ঔদ্ধত্যের উচ্চতা মাপে।
অফিসে আমি শ্রম দিই, সময় দিই, দক্ষতা দিই—
বেতন তার বিনিময়, অপমান তার শর্ত নয়।
কর্তৃপক্ষ মানে কি কণ্ঠ উঁচু করার লাইসেন্স?
নাকি অন্যের আত্মসম্মানকে টেবিলের ফাইলের মতো ঠেলে সরিয়ে রাখা?
পেটের দায়ে কেউ অনেক কিছু সহ্য করে,
তাই বলে সহ্য করাটাই কি শিষ্টাচার?
না, শিষ্টাচার মানে নিজেকে ছোট করা নয়,
বরং অন্যকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখা।
ভদ্রতা যদি দুর্বলতা মনে হয়,
তবে অসভ্যতাই আজকের সবচেয়ে শিক্ষিত মুখ।






হিমেল হাওয়া

অন্নপূর্ণা দাস

হিমেল হাওয়া এলে চারপাশের শব্দ বদলে যায়।
দৈনন্দিন কোলাহল ধীরে ধীরে সরে গিয়ে ভেতরে অন্য এক সুর জাগে।
মনে হয় নবদ্বীপের পথে কোথাও গৌরাঙ্গ এখনও হেঁটে চলেছেন।
দূর থেকে ভেসে আসে নামসংকীর্তনের দীর্ঘ, উজ্জ্বল ধ্বনি।
ধ্যান তখন শুধু বসে থাকা নয়,
জপ তখন শুধু শব্দের পুনরাবৃত্তি নয়,
হরিনাম তখন হৃদয়ের ভিতর দরজা খুলে দেওয়া।
আত্মা যেন নিজের কাছেই ফিরে আসে শান্ত পায়ে।
কখনও স্বামীজী-র বাণী,
কখনও আদি শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত উচ্চারণ
মনের জট খুলে দেয় অদ্ভুত সহজতায়।
যে প্রশ্নের ভাষা ছিল না, তারও উত্তর মেলে।
জগতের অনেক রঙ আজ আর তেমন টানে না,
শুধু এই আধ্যাত্মিক কথামৃতেই মানুষ বারবার ফিরে পায় শান্তি।







আঁচল

আ র তি  ধ র 

কখনো শুকনো
যেন তপ্ত দুপুর চিহ্ন রেখে গেছে
কখনো ভিজে
ওই ফোঁটা ফোঁটা স্বেদ-বিন্দু
জমা নিশ্চিত!
কোণে একটা গিঁট বাঁধা-
খোলা যায় না
কেবলমাত্র শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা মৌসুমে
সে গিঁট...
আমাদের বেঁধে রাখে নরম ছায়ার,
এক পৃথিবীর তলায়...





যাপন

স ন্দী প  রা য়  নী ল

জন্মের খড় মাটি সব
ধুয়ে গেছে পুণ্যতোয়া জল

কাঠামোয় এঁটো সময়
নিঃস্ব ক্ষেত, অঘ্রাণ

রাখেনি কিছুই, আশ্রয়
বা
বিরহ

সংসারে তবু
উৎসব উৎসব খেলা

কুয়াশার আলে
মুঠো মুঠো দানা ছড়িয়ে যাচ্ছে
ঈশ্বর-পথিক,
ওই...।






বোবা মানুষ

স ন্দী প ন  গু প্ত

কে শোনে কার চিৎকার
কে বোঝে কার আর্তি,
সবার চোখ শুধুই পড়ে 
যেটুকু যার বাড়তি...

চিন্তা ভাবনা বদল হয়ে
বদলে যাচ্ছে পড়শি,
টোপ দেখলেও অনেক মাছ
গিলছে না আর বড়শি...

সবাই ফেলছে মেপে পা
পিছল কাটার ভয়,
সমাজের কথা কেউ বলেনা
দেখেও অবক্ষয়...

নিজের পায়ে কাদার দাগ
মানুষ নিজেই মোছে,
ইচ্ছা হলেও বলতে পারেনা 
কথা নিঃসঙ্কোচে...






পরিতৃপ্তি

ঋ ষি রা জ  মো হ ন্ত 

গোরস্থানের ভাঁড় রাস্তা জুড়ে, ছদ্মবেশি আমরা।
পরিতৃপ্তির ছাতা বিস্তৃত করতে করতে ভিজে যাই
অবশেষে।
পঙ্গু শরীরে প্রতিদিন মিথ্যে হাসির পরিমিতি
সযত্নে গড়ে তোলা প্রতিমার মুখ লুকিয়ে দেখে আসে এক গোত্রহীন মানুষ।
গোপনে গোপনে সৎকারের কাজ চলে রোজ
তোমার  ছায়ায় আমি আত্মভুক দেখেছি।






কোনটা ঠিক

 স ন্দী প  কু মা র  মি ত্র

কাঁদছো কেনো, কাঁদছো কেনো দুখু মাঝি
দেখছো না দু'চোখের জল গড়িয়ে 
তোমার বৈঠা বেয়ে নদীতে গিয়ে মিশছে
জানেনা ও জল সাগর ছুঁতে পারবে কিনা
পৃথিবীতে কেউ সুখে নেই, কেউ না
সবাই সুখের তাড়নায় ছুটে বেড়াচ্ছে
হাহাকারে দিক দিগন্ত ভরে উঠছে
একটু সুখী হবার, কি নিদারুণ প্রচেষ্টা
ভেবে দেখো মাঝি 
ধনী যন্ত্রণা পায় ধন হারানোর ভয়ে
সাধু হাহাকার করে ইষ্টের দেখা না পেয়ে
খেলোয়াড়রা কষ্ট পায় খেলা ছাড়ার সময়
যৌবন আর্তচিৎকার করে সময়ের হাতছানিতে
তুমি— তুমি কেন কাঁদো মাঝি
দেখো দেখো বার্ধক্যের কেমন আকুতি
মৃত‍্যুর হাত থেকে রেহাই পাবার আশে
ভালোবাসা কেমন নিংড়ে নিচ্ছে নিজেকে
বুদ্ধি দিয়ে নিরাপত্তার বেড়া বুনতে
পশু পাখিগুলো খাদ‍্য খাদকের
ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে
সুখ, সুখ তুমি কোথায় পাবে ভেবে দেখেছো 
যেখানে বুদ্ধিই বেঁচে থাকার মাপকাঠি
এতেই মড়ক লাগে, জীবন দুর্বিপাক হয়
তবু ছাড়ে না ,শুধুই সুখী হবার তাড়নায় 
আসলে সুখ নামের মরীচিকার পেছনেই
ছুটতে ছুটতে মৃত্যুর ঘন্টাধ্বনি আসে কানে।
একবার ভেবে দেখো এতকিছুর মাঝে,
কতোই নির্লিপ্ত ওই শিশুদের মুখগুলো
ধুলোমাটির খেলাকে কতো আপন করেছে
সেখানে নেই কোনো ঝড়ের চিহ্নটুকু
আছে পরম স্নিগ্ধতার সুনিপুণ প্রলেপ
এটাই হয়তো দেবত্ব, যেটা ছোঁয়ার জন‍্য
কতো মানুষ আত্মবলি দেয়,
বার্ধক‍্যে যেখানে ফিরতে চায় ব‍্যাকুল মন 
সেই সরলতা আজ ধুলোয় গড়াগড়ি খায়
চাওনা মাঝি বুদ্ধির হাল বওয়া বন্ধ করে
সরলতার পাল তুলতে যেখানে 
প্রজাপতির মত স্নিগ্ধতা খেলে বেড়ায়।






আলো-ছায়ার বিজয়

অ ভি জি ৎ  শে ঠ

কোনো এক ব্যস্ত দুপুরে,
দুহাত বাড়ালাম—
ভালোবাসার গোপন সংবাদ,
জমানো হাজার অভিমান আর
সুরেলা প্রলাপ মিশিয়ে।
চারিদিকে বিজয় উল্লাস দেখে,
আমি অবাক হয়ে তাকাই।
পুজোয় তুমি আমি,
আর অজানা সেই রাত।
টুনির আলোয় আলোকিত রাজপথ,
আর শব্দ মেশা ঝংকার।
তোমার খোঁজে উতলা মন—
হ্যালুসিনেট করেছে বারবার।
তবু জানি—
এই হাহাকারও এক অদ্ভুত সুর,
যেখানে তোমার ছায়া খুঁজে,
মিশে একাকার হয়েছে আমার বিজয়।






ভ্রম নাকি বিষন্নতা?

সৈ ক ত  দা ম

আমি বিমান দেখিনি,
দেখেছি শঙ্খচিলের ডানা...
তাঁর মতো আমিও দেখেছি,
আমার মতো হাজার কবি দ্যাখে যা...
কেনো যে বৈরাগ্যের আতশবাজি,
আকাশে আঁকে ফুল...!
আমিও জানিনা তা,
জানেনা হাজার কবির দল...
দেখতে চেয়েছি জল,
দেখেছি কলার ভেলা...
বিষন্ন রাতের মতো উড়ে যায়,
বিমানের শব্দ...
আমি খুঁজি শব্দের আশ্রয়,
আমার বুক জুড়ে বিমান বন্দর,
কোনো দূরের পোতাশ্রয়...
ওয়াচ টাওয়ারে বসে শঙ্খচিল...
তাঁর দুটো চোখ...
চোখের তারায় বিকেল গড়ায়...
বিমানের ওঠা নামা...
আমি দাঁড়িয়ে থাকি ঠাঁয়,
তবু আমি বিমান দেখিনি,
দেখেছি শঙ্খচিলের ডানা...






বিকলাঙ্গ

গী ত শ্রী  সি ন হা 

শীত-সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে নীল দিন
প্রত্যাশার চাদর জড়ায়, 
জীবন থেকে উঁকি মারে স্বয়ং রঙিন 
সময়ের বস্ত্রহরণের পর সম্ভোগ... 
যে-কোনো লুন্ঠনে ছায়া লাগে... 
লাগে... ম্লান দীর্ঘশ্বাস... শৈশব আত্মার তীব্র অঙ্গীকার, 
অবিশ্রান্ত ঝিঁঝি ডাকের হাতছানি... 
জ্যোৎস্নার খিলখিল হাসিতে মৃত্যু শিয়রের কাছে দাঁড়ায়, 
একাকার হতে থাকে শব্দ উন্মত্তের ইশারায়... 
প্রতিবিম্বের কাছে নতি স্বীকার, 
বেহায়া শিহরণ দৃষ্টির অসহতার আঁচে পোড়ে...
শর্তহীন সভ্যতা আগুন জ্বালে ----- 
নিয়তি চোখ মারে কটাক্ষ-বানে তাদের দিকে...  

সারিবদ্ধ অন্ধ মানুষ লোকাল ট্রেনের কামরায়, 
জ্যোৎস্নাকে ভোগ করতে চায়... স্বপ্ন মেখে 
সৃষ্টিকালে ঈশ্বরের কার্পণ্য!
সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে, গিরগিটিদের একচ্ছত্র বাসস্থান দেখতে চাই না! 
পরিস্থিতি কাঁধে ঝুলিয়ে দেয় কিশোর কুমারের রের্কড করা কিছু গান ধরা এক বাক্স... 
শোচনীয় অন্ধত্বের সাথে বিকলাঙ্গ অচল শরীর 
কৃশ গলায় বলে চলে, " দিদিরা... দাদারা মাত্র পাঁচ টাকায় ইঁদুর মারুন"...
মাত্র পাঁচ টাকায় "স্বপ্ন"! আজ নতুন করে স্বপ্ন পড়তে শেখায়! 

মধ্য জীবনের কাছে প্রশ্ন তোলে সময়... 
দিগন্ত দেয়াল জুড়ে জীবনের প্রহরী...






ছাই ও রক্ত

অ ভি জি ৎ  বি শ্বা স 

তোমাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে।
শুকনো পাতা জড়ো করে
আগুন ধরিয়ে দিয়ে যায় কেউ।
পুরোনো স্মৃতির ছাই রক্তে মিশে গেছে—
একটু একটু প্রতিদিন।

নীরবতা ভাঙতে সময় লাগে।
ছেনি-হাতুড়ি নিয়ে বসে আছি,
পাথর ভেঙে মূর্তি বানাব
আরও একটি পাথরের।





হে পুণ্যশীলা

কো য়ে ল  তা লু ক দা র 

কত শত যুগের কালনাগ ছুঁয়েছে তোমার শরীর,
তবুও শ্বেত কমলের পাপড়িগুলো নীল হয়ে ওঠে
তীব্র উত্তাপে, ঘামজলে রং বদলায় তোমার শাড়ি—
মেঘলা গোধূলির মতো গাঢ়, আবার ঝড়ের পর স্নিগ্ধ।

কপাট খুললেই দেখি প্রথম আদিম প্রান্তর—
মুগ্ধতার নিঃশ্বাসে কেঁপে ওঠে লতাগুল্ম,
তরঙ্গায়িত রুপালি জল গড়িয়ে পড়ে
তোমার উপত্যকার গভীর নীল নদী থেকে।
লাজুক আলোয় তোমার সেই প্রান্তর
পৃথিবীর প্রথম বৃষ্টির মতো সজীব হয়ে ওঠে।

তুমি লজ্জার স্রোতে সাঁতার কাটো, ঈর্ষার জলে ডুব দাও,
একেকটি ঢেউয়ে হারিয়ে ফেলো পরিধেয় অলঙ্কার,
অবেলায় খুলে রাখো পৃথিবীর সব ভার—
নিরাভরণ হয়ে ওঠো নবজাত ভোরের মতো নির্মল,
আদিম, অস্পর্শ, অচিন্ত্যরূপা।

আমি তখন তোমার অস্তনদীর জলে নামি ধীরে,
সেও এক পবিত্র গহ্বর—
যেখানে জল গাঢ়, আলো নরম, বাতাস উদ্দাম।
আমি অবগাহন করি তোমার নরম ঢেউয়ে,
তোমার নিশ্বাসের উষ্ণ বাষ্পে ধুয়ে যায় আমার পাপ,
অন্তর শুষে নেয় স্রোতের শুদ্ধতা।
আমি ক্রমে পুণ্যবাণ হয়ে উঠি
তোমার দেহধারার পবিত্র স্নিগ্ধতায়—

হে পুণ্যশীলা,
তোমার আদিম জলে ডুবে জন্মাই আমি আবার,
নতুন, অনাবৃত, অনন্তের মতো পবিত্র।






সামাজিক মস্তিষ্ক

সূ র্য্য না রা য় ণ  ঘো ষ

এই বিরাট বিশ্ব হাটে
তুমি আমি শুধু ক্রেতা।
ওরা ভাবায় আমরা ভাবি 
নিজেকে স্বাধীনচেতা।

একই মনুষ্য জাতি
তবুও বিষের ফনা
একজন শুষে খায়
শোষিত লক্ষ জনা।

একজন বাঁধে বুদ্ধি 
আর বাকিসব দুর্বল 
সাজানো পথে চোখ বুজে চলে
যেমন ভেড়ার দল।





পাখিবাজার

পা য়ে ল  দে ব

দেহের ভেতর একটা হেমবর্ণের সরলবর্গীয় জলাশয়
গভীরে সদরঘাট তলিয়েছে কবেই
এক পাখি-বিক্রেতা বসতেন
কোথা কোথা থেকে যে আনতেন পাখিগুলো
অদ্ভুত সব নাম

এখন পুকুরের নতুন ঘাট
বসি, বসলেই একটা করে পাখি এসে বসে যায় কাঁধে
কিসব ভাষায় কথা বলে কানের কাছে
জলাশয়ের নিকট এমন বসে থাকা নিয়ে পড়ে থাকলে
একদিন সত্যি কালা হয়ে যাব।





ভালোবাসা

টু লা  স র কা র 

জীবনে ভালোবাসার খুব অভাব। 
আমিও যাকে খুব ভালোবেসেছি, সে কখন আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। 
ভালোবাসা কথাটা সত্যি খুব ছোট, এর বিস্তৃতি বিপুল বিশাল। 

ভালবাসি ভালবাসি কথাটা এখন ভীষণ সহজলভ্য। 
আমিও ভালবাসতে চাই। 
ভালোবেসে পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ কষ্ট ভুলে থাকতে চাই। 
একটা 'কিন্তু' মাঝখানে ঢুকে যায়। 
তাকে কিছুতেই সরানো যায় না। 

আমিও চাই একটা উদার হৃদয়, বলিষ্ঠ কাঁধ, ঋজু শিরদাঁড়া। 
হয়তো দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।
ভালোবাসি বলতে ভীষণ ভয়। 
আমিও চাই আমাকে নিয়ে কেউ ভাবুক, 
সকাল সন্ধ্যা কথা বলুক। 
আমিও ভালোবেসে হারিয়ে যেতে চাই ওই হৃদয়ের ভিতর। 

ভালোবাসা আমায় ঠকায়। 
বিচ্যুত করে আমার  ভাবনাকে। 
কে এমন আছে, ভালোবাসা কে ঈশ্বরের মতো পুজো করবে। 
তার কাছে একজনই শ্রেষ্ঠ হবে। 
ঘুরে বেড়াবে না দ্বারে দ্বারে ভালোবাসার ভিখিরি হয়ে। 

কেন বুঝতে চায় না কেউ। 
ভালোবাসা হৃদয়ের প্রতিষ্ঠিত পবিত্র মন্দির। 
তাকে ভালো না বেসে পারা যায় না। 
ভালোবেসে নিঃস্ব হতে চাই রিক্ত হতে চাই। 
তবুও ভালবাসতে চাই। 
ভালবাসার মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই। 

একটা সুন্দর পবিত্র মন ভালোবাসা কে ঘিরে থাকে। 
কত রকম ব্যাখ্যা আছে ভালোবাসার। 
আমার ব্যাখ্যা হৃদয়ের মিলন। 
শরীর সেখানে উহ্য।
যার সাথে একদিন কথা না বললে, সময় কাটে না। 
কি যেন একটা 'নেই' হারিয়েছে মনে হয়।
তার গলার স্বর ভালোবাসার হৃদয়ে প্লাবন এনে দেয়।
অভিমান অনুরাগ,বিরাগ  আবেগ নিয়ে ভালোবাসা। 
ভালোবাসা চির ভাস্বর  একটা অনুভূতি।





অজুহাতের অজুহাতে

ম ঙ্গ লা  দ ত্ত  রি মি 

পঁচিশ বছর ধরে সেই কন্ঠস্বর,
কেঁপে ওঠা বুকের বাঁ পাশে মেঘের মিছিল।
চেনা পথ যখন হারিয়ে যায় নামহীন কোনো সাঁওতাল পাড়ার মোড়ে, যখন ঢাড়বাড়োর পুজোয় ব্যস্ত হয় সাঁওতাল রমনী, সেই এক সন্ধ্যায় রজত জয়ন্তী পালনটা ও অজুহাতের অজুহাত মাত্র।

মস্ত বড় একটা ছাদ, সিলিং ফ্যানের হাওয়ায় উড়ে আসে প্রিয় সুগন্ধির আভাস, নিশ্চুপ নীরবতায় ঢাকা ঘরের একপাশে শোনা যায় টিকটিক শব্দ,  দুটি জীবন্ত সরলরেখা হেঁটে চলে বহুদূর, অথচ কাটা পড়ে না একই বিন্দুতে ।

আসলে সময়ের অভাবে কিংবা ব্যস্ত স্বভাবে ।
যাই বলা হোক না কেন, সমস্ত কিছুই ঘুরে ফিরে সেই একই গোলকধাঁধায় হারিয়েছে কেবলমাত্র অজুহাতের অজুহাতে ‌।

অনুভূতিরা আজ মৃতপ্রায় পরিযায়ী মাত্র,
পিপাসু  চাতকের মতো ইচ্ছেরা ছটফট করে রাতের আঁধারমাখা ঘরের পশ্চিম কোণে, 
জীবন ছুটে চলে নাজেহাল— অজুহাতের অজুহাতে।






আমিও তোমার মত নিঃসন্তান হয়েছি এখন

অ ভি জি ৎ  ঘো ষ

আজও রোজ তোমার সিঁথিতে সিঁদুর পরাই।
নিয়ম করে রোজ সুখ দুঃখের কথা বলি।
ভালোবাসারও।
একা একাই।
যদিও জানি তুমি সমানে উত্তর দাও সে সব কথার।

রোজ মেয়েও কথা বলে।
আনন্দে, অভিমানে, কষ্টে -  দুঃখে এবং ভালোবাসায়।
হয়তো শুনতে পাই অথবা অশ্রুত থেকে যায়।

কল্পনায় নয়,
জাগ্রত স্বপ্নে ওরা আসে।
হয়তো বাস্তবেও যদিও অদৃশ্য।

একদিন, ঠিক জানি, আবার দেখা হবে, হবেই।





ভালোবাসার রং

পি ন্টু  হা টি

সব ভালোবাসার রং এক নয়,
রাজনীতির পতাকার মতো বেঁধে রাখা যায় না!
আমি ভালোবাসবো বললেই তোমায় বাসতে হবে—
এমন আশা করাও তো অন্যায়!

তেমনি প্রেম যদি শুধুই দুঃখের স্রোত হয়,
তবে তা কি সত্যিকার প্রেম হতে পারে?

মুক্ত চিন্তা, মুক্ত অনুভূতি—
যা জীবনের ঝড়েও অবিচল থাকে,
যেভাবে তপ্ত আগুনে লোহা পায় নতুন রূপ,
প্রেমও কি সেভাবেই পরিশুদ্ধ হয় না?

ব্যথাই যদি ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়,
তবে সেই ব্যথা হোক মুক্তিরও রঙ,
নয়তো তা নিছক বোঝা মাত্র।

সত্যিকারের প্রেম অবহেলায় মলিন হয় না,
ভালোবাসা তো কেবল দায়িত্ব নয়,
ভালোবাসা এক শুদ্ধ স্পর্শ—
যা আমাদের সম্পূর্ণ করে।





আগের মুহূর্তে

চা ন্দ্রে য়ী  দে ব

ঘোর কৃষ্ণবর্ণের নীরদ
নীলাভের আসনে আবৃত
নেমে আসলো সৌদামিনী
সকাতরে কাঁদছে সবুজ
প্রাণহানির আশঙ্কায় ডুবে
ঠিক আগের মুহূর্তে
নীল আকাশে সাদা মেঘ
সকালের মেজাজ ফুরফুরে
একইসুরে বিহগের কলতানে
দিনের শুরু হয় আনমনে
দিন পাল্টায় অস্থির মনের
 রং বদলায় নিসর্গের।।





শীত বড় ভয়ংকর
 
জুঁ ই  রা য় 

আমারও একখানা মোটা উলের চাদর ছিল।
অনেকগুলো বছর আগে একটা ভয়ংকর দমকা হাওয়া কোথা থেকে যে এলো,
সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে চলে গেল বহুদূরে।
আমার সেই একমাত্র শীতের সম্বলখানা 
সেদিন ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো,  আমি চারিদিকে ছুটে বেড়িয়েছি, কত খুঁজেছি,
কিন্তু কোনো লাভ হয়নি তাতে।

শীতের তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়েছিলাম আমি।
পায়ের গোড়ালি ফেটে এখনও লাভার মত রক্ত ঝরে পড়ে।
এই শীত আমাকে একসময় হতাশ করে দিয়েছিল , 
সেই হতাশা কাটিয়ে আমি পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখতে শিখলাম,
জানতে পারলাম বেঁচে থাকা কতটা কষ্টকর।
ধীরে ধীরে মেনে নিলাম, হারিয়ে যাওয়া সেই উলের চাদর
 আমি আর কোনোদিন ফিরে পাবো না, 
কোনোদিন না।

আমার অভাগিনী মা আমাকে আর ভাইকে সঙ্গে নিয়ে 
বেরিয়ে পড়ল বনে জঙ্গলে।
পোকা-মাকড়দের ছোবল থেকে বেঁচে ফিরে ফিরে 
রোজ একটু একটু করে খড়কুটো-কাঠ সংগ্রহ করেছি,
সেখানে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন!
আমাদের বরফ হয়ে যাওয়া দেহ গলে গলে ফিরিয়ে আনছে 
নিজের সামান্য অস্তিত্ব,
নিজেদের টিকিয়ে রাখার অস্তিত্ব,
বেঁচে থাকার অস্তিত্ব।।






জলপাইগুড়ি

ভ বে শ  দা স

বহু বছর শেষে 
জলপাইগুড়ি ঘুরে এসে 
আমার পুরনো প্রিয় শহর 
ভরে গেল মন 
দেখছি চারিদিকে 
কেবল সুন্দরই সুন্দর। 

তিস্তার বাঁকে 
জলপাইগুড়ি এক সুন্দর নগরী 
গড়ে উঠেছিল বহু বছর আগে 
করলা নগরীর মাঝে 
মিশেছে তিস্তার বুকে 
বেড়েছে নগরীর রূপ 
বেড়েছে অধিবাসীদের সুখ। 

মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ালাম একা 
অনেক কিছু নতুন দেখলাম 
অনেক কিছু পেলাম না খুঁজে 
শহরের আধুনিকতায় অনেক কিছু গেছে বুঁজে।

মনে পড়ে যায় ১৯৬৬ সালের কথা 
সব স্মৃতি এখনো মনে আছে গাঁথা 
রূপশ্রী, রূপমায়া, দীপ্তি 
সিনেমা দেখে মনে আসতো তৃপ্তি। 
নিরালা রেস্টুরেন্টে বসে 
খেয়েছি মোগলাই কফি মন কষে।
বাজতো সুন্দর ইংলিশ মিউজিক সুর 
থাকতো না আর মনের অবসাদ 
সব হয়ে যেত দূর। 

কদমতলা সুন্দর সাজানো গোছানো বাজার 
সবকিছু পাওয়া যেত হোক না দাম হাজার। 
রায়কত পাড়ার রাজবাড়ির সামনে সরোবর 
বনেদিআনায় সবার উপর 
পড়তো সবার নজর।

মনে পড়ে যায় তিস্তার বন্যা সাল ১৯৬৮ অক্টোবর মাস 
বাঁধ ভেঙে জলপাইগুড়িতে আসে প্লাবন 
প্রচুর মানুষ জীবজন্তু গাছপালা শষ্য দানা 
ভেসে যায় অনেক কিছুই অজানা। 

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পলিটেকনিক কলেজ এসি কলেজ  পিডি কলেজ 
বিটি কলেজ শিক্ষায় ছিল উত্তরের উর্বর 
তাই জলপাইগুড়িকে করতো সবাই কদর। 
আর কত কি বলার ছিল 
লিখলাম না আর বেশি 
আমরা সবাই জানি। 
তাও পুরনো কথা লিখে আমি হলাম খুশি।






সম্পর্ক

উ জ্জ্ব ল  চ ক্র ব র্তী

একদা কী ভীষণ প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলাম আমরা
ঠা ঠা রোদ্দুরে আলের ধারে বসে ছুঁয়েছি তোমার মন, অথচ--- চুম্বনবিলাসী হ‌ইনি, 
মাটির দাওয়ায় যখন জ্বলে উঠেছে
হ্যারিকেনের আলো---
অলৌকিক আঁধারেও বিশুদ্ধতাবাদ স্থির ছিল নিজস্ব ভুবনে,
      
তবু একদিন ভুলে গেলাম সব।

হাতে হুইস্কির গ্লাস, ঠোঁটে সিগারেট---
লোকে বলে বেয়াদপ,
চাইলেও জীবনকে কখনো ছুঁয়ে দেখা হবে কি আর?

যদিও অনিন্দিতা বলতো
সম্পর্ক মোছা যায় না কখনও, 
ছিঁড়তে গেলে সুতোর মতো জড়িয়ে যায় আরও... অজান্তেই।





ত্রুটি

শা ন্তা  ভৌ মি ক

ঈশ্বরের অস্তিত্ব খুঁজতে গিয়ে শূন্য হাতেই ফিরে এলাম,
সব থেকে বেশী একা সেদিন মনে হলো নিজেকে 
কেনো এই পৃথিবীতে মানুষের জন্ম খুব জানতে ইচ্ছে হলো,
কিন্তু অনন্তকাল যে ঘোরের মধ্যে বসবাস করেছি তার কামুক দংশন থেকে বেরিয়ে আসা বোধহয় সহজ নয়...
আত্মার টুকরোগুলো গুছিয়ে ফেলা সহজ নয়;
যতই ছায়া দিতে চাই না কেনো কোথাও একটা স্ফুলিঙ্গ জ্বলতেই থাকে!
নেভে না;
ঘুমোতে দেয় না।
ঘুমের ভেতরে জাগিয়ে রাখে ঈশ্বর!
জীবন্ত হয়ে শুধু দগ্ধ হয়ে যাও 
এখন আমি ঈশ্বর খুঁজি না
নিজেকে খুঁজি 
আমার আত্মার টুকরোগুলো যে খাঁচাতে ফেলে এসেছি 
তাকেই আবার ফেরত নিয়ে যাবার কথা ভাবি 
ভাবতে ভাবতে কম্পমান সমুদ্রে ডুবে যাই।
এর মধ্যেই ঘর পুড়ে যায়;
ধোঁয়া ওঠে,
আশপাশ থেকে মানুষ দৌড়ে আসে...
জল থৈ থৈ করে দিয়ে তারা চলে যায় 
কিন্তু আমি ঈশ্বর খুঁজে পাইনা 
না পাই আমার আত্মার শরীর।





প্রকৃতি ও আমি

ত প ন  ম ন্ড ল 

প্রলম্বিত দিগন্তের ঊর্ধ্বে চঞ্চল চলন্ত নীলাম্বুর পানে চেয়ে অন্তর ব্যগ্রতা মেটে। 
পিটপিট চাহনি আর পেঁজা নীরদের আনাগোনায় হৃদয় গহন হয় শমিত। 

গজগিরি দূর থেকে দূরে বসিয়াছে তার গ্রামের পর গ্রাম।
মহীধর রাজীব পায় নিবিড় অরণ্য সবুজ মেহেন্দির পরশে।

বিহঙ্গের কলরবে, মৃদু বাতাসে ছায়াবৃক্ষ তলে নির্জন পর্যটক নিসর্গের সম্ভোগে।
কালের বেড়াজালে হরিৎ কল্পলোকে
ডুবে মধ্যাহ্ন গড়িয়ে হয় সাঁঝ।

বিহানে উঠি, দেখি সাদা আলোয়ানে  গিরিরাজ নিস্তব্ধ নিদ্রায়। 
তরঙ্গিনী নিষ্ঠুর মায়াবী দানবী কলরবে ভূখণ্ড বিদীর্ণ করে ছোটে  স্বমহিমায়। 

প্রাতঃকালে তপন স্বর্ণ ঢালে গিরি শিখর অবয়বে।
ক্ষণিক এ চিত্রে, চিত্ত  মাতোয়ারা।
হৃদয় প্রকোষ্ঠ তবুও যে অপূর্ণ...
অপূর্ব সৃষ্টির স্রষ্টা গোপনে হর্ষে নিরলে।






শিকল খুলে

ক বি তা  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য় 

আজকাল কিছুই ভালো লাগে না আমার 
তেমন কোনো কারণ নেই যদিও,
 কারণ খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টায়
এই প্রবল শীতেও ঘেমে নেয়ে একসা...

হাঁকুপাকু মন বিদ্রোহের স্লোগান তোলে হঠাৎই;
কঠিন শিকল খুলে বেরোনোর অদম্য ইচ্ছেয়
মাথা খোঁড়ে বহু শ্রমে গড়ে ওঠা শক্ত প্রাচীরে, 
অগত্যা খুলে দিতেই হয় দরজা...

হুহু করে ঘরে ঢোকে হিমেল হাওয়া!
কেঁপে উঠলেও 
আমি সর্বাঙ্গে মাখি শীতলতা এবং 
ক্রমশই উষ্ণ হয়ে উঠতে থাকি...

কিন্তু পরক্ষণেই শালে ঢেকে নিই আমার আমিকে...
এই বয়সে ঠান্ডা লাগা অন্যের মনোকষ্টের কারণও হতে পারে...





আত্মদাহ

রা জ ন্যা  ভৌ মি ক 

মানুষের ভিড়ে
শহরের বুকে দাঁড়িয়ে
এক ফাইভ-স্টার হোটেল।

হঠাৎই দুষ্কৃতীরা এসে—
দখল করে হোটেল।

গোলাগুলিতে ছিটকে থাকে
কাচের টুকরো,
রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত লাশ।

জানেন, এরা কারা?
এই মৃতেরা?
আমাদেরই ইচ্ছে,
ভালোবাসা, আশা, ভরসা।

আর যারা দখল নেয় —
এই বহিরাগতরা?
তারা তো আমাদেরই পোষা —
রাগ, জেদ, অহংকার, অভিমান।

শহরের বুকে থেকে যায়
শুধুই ইট, কাঠ, পাথরের হোটেল।
ঠিক যেভাবে মনের ভেতর
থেকে যায় অসমাপ্ত গল্প।





মানবতা প্রশ্নের মুখে

অ রু ণি মা  চ্যা টা র্জী 

প্রায়শই আমি একটা ছবি দেখি।
এক গৈরিক বিকেল, পা ছড়িয়ে বসে আছে এলো চুলে!
তার অবাধ্য কুন্তলে, কতো জোনাক, কতো প্রজাপতি নিশ্চিন্তে খেলা করে। 
ঝিল থেকে উড়ে আসে পাখপাখালি,
আনমনে গোধূলির প্রতীক্ষায় উড়ে যায় 
নিশ্চিন্ত বটের আশ্রয়ে।

চিৎ হয়ে আকাশটাকে মুঠো বন্দী
করতে চেয়েছিল, আমার বন্ধু আব্দুল!
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ও মুক্তি পেয়ে 
আকাশের সাথেই আজ সহবাস করে। 
ওর আম্মুর ঘোলাটে নিভে যাওয়া চোখে 
সেদিন জল দেখিনি!

না! কোন গান স্যালুট বন্ধু, 
তোর বিদায় বেলায় ছিল না!
বারুদের গন্ধ মেখে, ভীষ্মের শরশয্যায় 
শেষবার আলিঙ্গন করে, বন্ধুকে বলেছিলাম 
শয়তানের কি মৃত্যু নেই?
বারবার মরে যাবে বিবেক আর শুভবুদ্ধির দল!

আমার আর ঘরে ফেরা হলো না!
গাছেদের শরীর দিয়ে, ছোট ছোট বেড়া বাঁধার 
সসীমতার অঙ্গন ডিঙিয়ে, 
আজও আব্দুলের আম্মুর প্রশ্নের উত্তর 
খুঁজে চলেছি। 

ঘর কোথায়?
সাবেকী নিয়মে, বটের ঝুরি বেয়ে সন্ধ্যা জড়ো হয়,
শেকড় ছড়িয়ে যায়, কাঁটাতারের তর্জনী উপেক্ষা করে।
লালনের গানের ভেলায় চড়ে 
এবার আমার ঘরে ফেরার পালা!
মানবজমিনে, রুপোলি ফসল 
গোলায় তোলার সময় এলো বুঝি!






শুরুর দিকে

সং হি তা  ভৌ মি ক 

কোনো এক অবেলায় হালকা হিমেল হাওয়া 
যেনো বিষণ্ণতার চাদর মুড়ে,
বড়ো জানতে ইচ্ছে হয়—
কি হয়েছে প্রকৃতি?
কেনো ক্ষণিক দুঃখের ছদ্মবেশ ধরো?
খেয়াল করেছে কি কেউ—
কখনও সেও লুকিয়ে কাঁদে ,
হঠাৎ যেনো বড়ো একা লাগে তার,
আসতে আসতে হয়তো সবটাই সয়ে যায়,
মেনে নেওয়া নিয়ম বাঁধা ঋতুর বৈপরীত্য,
তেমন করেই গভীর রাতে টুপটাপ শিশিরের শব্দ,
হারিয়ে যায় ভালোবাসার উষ্ণতার মাঝে॥






অবজ্ঞা

তি তী র্ষা  জো য়া র দা র 

বেশ!
প্রবঞ্চনার মিথ্যে আশ্বাস দু'হাত দিয়ে তুলে নাও 
পা দিয়ে ঠেলে ফেলে দাও সমস্ত স্নেহ 
সমস্ত পাশে থাকা 
এই শরীর, এই বিস্তর আবেগ 
অস্বীকার করো 

চেয়ে দেখো,
তোমার অবহেলায় 
ঈশ্বর হাসছেন 

ভালো থেকো,
ভুলে থেকো, 
যতটা সম্ভব ভুলে থাকা যায়





বেতগারা

জ য় তো ষ  ঘো ষ 

স্টেশনের পাশে কুয়াশার কোয়ার্টার 
বাজিয়েছে বাঁশি, টেনেছে ভৈরব।
মেঠো পথ ছুঁয়ে বেঁকে যায় রেললাইন। 
নিশ্চুপ সাঁকোটির প্রতিবেশী ধানখেত, 
আগামীর পরদিন ছেড়ে যাবে চেনা ঘর। 
জমি কাঁদে, কাঁদে সাঁকোটির বাঁশ।
জলে বসে মাছ ধরে মিস্ত্রীর বড় ছেলে দীনু জেলে।
বড় ঝিলদের দেখে তার চেয়ে বড় তিস্তা,
ভাগাড়ে আজকাল শকুনের দেখা পাওয়া দায়!
শুনেছি মানুষের ভেতর ভর করেছে
হরতালের প্রাণী।






কান্না শুনতে পাবে

গৌ রা ঙ্গ  সু ন্দ র  পা ত্র

কান্না শুনতে পাও?
পাবে না, এত সহজে কেউ কান্না শুনতে পায় না।
কান্না শুনবে যদি নিঃসঙ্গ নিঃসহায় হয়ে
অনিশ্চয় অনির্ভরতার মধ্যে গভীর রাতে
রাস্তার মাঝখানে শুয়ে থাকো
ঠিক যেমন নির্বাক ডিমের মতো নিশ্চল হয়ে
রাস্তার পাশে একাকী পাথর পড়ে থাকে।
কান্না শুনতে পাবে
রাস্তাটা সারাদিন পরে গভীর রাতে কাঁদে।

এমনিভাবেই গাছ কাঁদে
পশুপাখি কাঁদে
পাথরও গড়াতে গড়াতে কাঁদে
অবশেষে পাথরের কান্না থামে 
পুরুষের লোমশ উরুর মতো
পাহাড়ের সানুদেশে এসে।
একটু অনুভূতিশীল হদয় চাই
রাস্তার কান্না শুনতে পাবে।

তাই গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে
কখনো কখনো কেউ কেউ বলে

 কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছো?





অভিমান

চৈ তা লী  ধ র  ম ল্লি ক 

তোর দেওয়া দুঃখ পাবার পরে 
আমার আঁচল জুড়ে শুধুই  হাসনুহানা 

সন্ধ্যে নামলে...
আমার হাসনুহানাদের গন্ধ
তোর ফেলে যাওয়া বিরক্তিকে 
দারুণ যত্ন নিয়ে সাজায়।

তির্যক কাঁটার মতো শব্দ তোর।
আমি ঘুমোতে চাইলে, 
পাশ ফিরে শুয়ে আছে এক স্বপ্ন অপেক্ষায়...
...যার মাঝখানে তোকে রেখে 
আরো একবার হয়ত সেরে নেব নৈঃশব্দের বর্ণনা। 
কিম্বা তোর জন্য, আঁকব এক পাগল করা
ঘন অভিমানী দুটো চোখ।






জীবনানন্দ

বি মা ন  বি শ্বা স

হেমন্তের এই শহরে
ট্রামের শব্দের সাথে রক্তের ফোঁটার কান্নার স্বর ঝরে পড়ে...

ইচ্ছে হয় স্বার্থপরের মত
মুঠো ভরে ভাবনার সাথে মিশিয়ে খাই।

তামাশা করে দিনগুলো কেটে যায়।

তারপর—
প্রতি সন্ধ্যে শেষে বুঝি;
তুমি পুরোনো অভ্যেসে
জোছনার প্রাচীন সুখে মেখে আছো
আমি মরণপণ
বিড়ালের চোখ দিয়ে তোমাকে খুঁজে যাই।

কোকিলের গানে আলো ফুটলে 
যুদ্ধের হাঁক ডাকে, খিদের ব্যস্ততায় ভাবি 
আমার এই অপেক্ষার শেষ কোথায়?






পরিবর্তন

দে বা ঙ্গ না  চৌ ধু রী 

আগুন জ্বলে উঠেছিল একদিন, অন্ধকারে,
একটি স্পার্ক, একটি শিখা, সেই থেকে শুরু পরিবর্তনের গাথা।
পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে আবহাওয়া,
আগে যেখানে ছিল আগুনের গর্জন,
আজ সেখানে সবুজের স্পন্দন।
এককোষ থেকে বহুকোষ, সৃষ্টি থেমে থাকেনি,
তাহলে কেন থামবে মানুষ?

পাথরে ঘষে আগুন জ্বালাতে শেখে,
একদিন হাঁটতে, একদিন লিখতে, তারপর একদিন পৌঁছে যায় নক্ষত্রের ছোঁয়ায়।

এবার পরিবর্তন আসবে মানসিকতায়,
উপড়ে যাবে সংস্কারের শিকড়।
ছেলেরা হবে সংবেদনশীল, অনুভব করবে,
মেয়েরা হবে বলিষ্ঠ, আত্মবিশ্বাস গড়বে।

নিঃশব্দ কান্না যখন উত্তরাধিকারী হয়,
তখনই শুরু হয় এক নতুন যুগের।
প্রতিটি পরিবর্তন ভাঙবে পুরানো দেওয়ালকে,
আর জন্ম নেবে নতুন এক পৃথিবী।





মায়ের জীবন ফলার

অ র বি ন্দ  স র কা র 
           
বাবা যখন মরে, তখন আমি মায়ের জঠরে, 
কি এমন করেছিলো মা পাপ, 
ছেড়ে ফেলে গেছে মোর বাপ্!
শাক, গেঁড়ি গুগলি শামুক ঝিনুক তুলে,
বিক্রি ক'রে মা আমার তরে খাদ্য জুগিয়ে চলে।
শুকনো মায়ের বক্ষের দুধ, চামড়ায় গেছে মিলে,
অভাবীর মা, অভাব তাকে খেয়েছে গিলে!
ভিক্ষা চায়নি, হাত পাতেনি কারো কাছে, শীত গ্রীষ্ম বর্ষা শুধু খালে বিলে,
এসব শুনে আমার এখন চমকায় পিলে,
নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখ চেয়ে,
জীবন সংগ্রামের সৈনিক মা, কতো বাধা এসেছে তার দিকে ধেয়ে।
গ্রামের পাঠশালায় শিখিয়েছে লেখাপড়া,
যেটুকু শিখেছি ওতেই ঠকাতে পারবে না কেউ, আমি মায়ের হাতে গড়া!
গতর খাটালে পয়সা মেলে, কুঁড়েমি আলসে অনুদানে,
বাড়তি কাজে, বাড়তি পয়সা, কল কারখানায়, চাষে সাফল্য নিজগুণে।
শিরদাঁড়া সোজা রেখে চললে, কেউ বেগার পারবে না খাটাতে,
শিরদাঁড়া নোয়ালে, চামচেগিরি পদে, নেতা, মন্ত্রী, মালিক— দ্বিধা করবে না, খারাপ কাজে নামাতে।
আমার শ্রম আমার মূলধন, আজ আমি গর্বিত মায়ের তরে, 
দুবেলা দুমুঠো ভাতের অভাব নেই, তাছাড়া অতিরিক্ত আয়ে সংসার উঠেছে গ'ড়ে!
মায়ের যত্ন সেবা, দায়িত্ব আমার,
চান করানো, নিত্য সেবা আহার,
ইচ্ছে মায়ের জীবিত কালে, মায়ের সামনে, মানুষকে আমন্ত্রণ খাওয়ার,
শ্রাদ্ধ শান্তি মঙ্গল কামনা, বামুন নিয়ে কারবার,
মায়ের আশীর্বাদ প্রতিনিয়ত, তবুও চরণযুগলে মাথা ঠেকিয়ে দোষ ত্রুটি সাবার।
গোটা গ্রাম হলো ধন্য, 
জীবদ্দশায় মাকে না খাইয়ে, মরণে মানুষকে খাইয়ে, পিণ্ডি চটকিয়ে বামুনের পোঁটলা ভর্তি, ঘুচবে না দশা দৈন্য।
মায়ের সামনে আয়োজন, মা দাঁড়িয়ে সর্বক্ষণ, 
গরীব না খেতে পাওয়া মানুষের বিশেষ আমন্ত্রণ।
পরিবেশন, পাতা কুড়িয়ে, মাথায় তুলে জলে বিসর্জন,
পিতৃসেবা থেকে বঞ্চিত, কিন্তু মায়ের সেবা, আশীর্বাদ আজ আমার মূলধন।





নতুন ধান

সো ম দ ত্তা 

আলের ধারে বসেছিল ছেলেটা, একা।
বিষন্ন মন, অবসন্ন শরীর, 
বসে থাকার দরকার নেই, 
তাও ছিল। 
দেখছিল, ধান গাছের উপর দিয়ে হাওয়ার যাতায়াত, 
সোনালি ধানের মাথাগুলো নুইয়ে পড়ে, 
আবার সোজা হয়। 
উন্নত মস্তক। 
ওকেও যে মাথা নত করতে হয় 
মহাজনের কাছে। 
নীল আকাশের সাথে সোনালি ধানগাছ মিলেমিশে যায়,
সেখানে ও রঙের খেলা, 
রঙ দেখে তো পেট ভরে না। 
ও দেখে নতুন ধান কাটার ছবি, 
শোনে ধান কাটার গান, 
বনবিবির সুরেলা সুরে ও ভাতের গন্ধ পায়। 
বাড়িতে ছো ভাইবোনগুলো 
পেট ভরে ভাত খাচ্ছে, 
পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কার সুবাস।
মা দুধ চালের গুঁড়ো গুড় দিয়ে নবান্ন দিচ্ছে,
লক্ষ্মীঠাকুরকে।
ধূপের ধোঁয়ায় চারিদিক ঝাপসা লাগে,
ঘোর লাগা চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায় ছেলেটা।
মহাজনের লোকেরা ধান কেটে গোলায় নিয়ে যাচ্ছে। 
আজ আবার কলমী শাক সেদ্ধ,
কাল যে নবান্ন...
আলের পথ ধরে হেঁটে যায় ছেলেটা, 
দরকার নেই, তাও হাঁটতেই থাকে, হাঁটতে...






পড়ন্ত বিকেলে যায় চেনা...
             
ত নু শ্রী  ম ণ্ড ল 

রক্তের স্রোত থেকে যন্ত্রণা উঠে আসে,
উষ্ণ প্রস্রবন বইছে ঘরের আনাচে- কানাচে;
মেরুদণ্ড বেয়ে নামে ঘর্মাক্ত আস্ফালন...
       তীব্র ভাষার ঝঙ্কার শরীর-মন  ছুঁয়ে যায়।

আজ আর উপসংহারে কিছুই লেখা হয়ে ওঠে না,
     শুধু অনুরাগের ঠিকানায় লেখা হয় নাম।

প্রাচীর ভেদ করে জেগে ওঠে নিঃশব্দ কান্নারা,
     মুখোশের আড়ালে ভাঙা কাঁচ!
       পড়ন্ত বিকেলেই কি যায় চেনা?
অযাচিত শব্দ ছাপ রাখে ক্যানভাসের পাতায়।






তারা খসার আলোয়

তী র্থ ঙ্ক র  সু মি ত 

কিছু বলার থেকে 
চুপ থাকাটাই শ্রেয়
মতামতের পেন্ডুলামে সময় আটকে আছে 
ইতিহাসের চোরাস্রোতে 
তাই এখনও জোয়ার কিম্বা—
মনে পড়ে যায় ফেলে আসা অতীত 
মুখে-চোখে 
বিবর্ণতায় ঢেকে যায় শহর 
তোমার কথায় জেগে থাকা রাত 
অন্ধকারে মাখামাখি বারুদ এখন!

তারা খসার আলোয় নিজেকে দেখি।





গণতন্ত্রের কবর

স্বা তী  রা য়  চৌ ধু রী

পাগল লোকটা লাশকাটা ঘরে গেছিল
তন্নতন্ন করে কী খুঁজছিল;
জিজ্ঞাসা করলাম, কাকে হারিয়েছ,
স্ত্রী,ছেলে, মেয়ে না ভাই?
লোকটা শুধু চিৎকার করে বলল,
নেই, নেই, এখানে নেই
লোকটা এরপর দৌড়ে গেল পুলিশ থানায়,
পুলিশের ধ্যাতানি খেয়ে বাইরে বেরিয়ে এলে আমি বললাম, কী খুঁজছ, বলনা আমায়, কোনও সাহায্য তো করতেও পারি তোমায়
সে দাঁত খিঁচিয়ে বলল, যান তো যান, ম্যালা বকবক করেন ক্যান?
অতঃপর ধ্যাতানি খেয়ে বাধ্য সারমেয়র মত মুখ বুজে তার পিছু নিলাম আমি;
কী মনে হতে আমায় ডেকে বলল, চলেন তো একবার রেললাইনে নামি
তারপর রেললাইনে নেমে হঠাৎ লোকটি চিৎকার করে বললে, ইউরেকা
আমি জিজ্ঞাসা করলাম যাকে খুঁজছিলেন তার পেলেন কি দেখা?
লোকটি কিছু না বলে রেললাইনে পড়ে থাকা একটা রক্তমাখা খাতা তুলে নিল হাতে;
দেখলাম রবিঠাকুর, বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন, সুভাষচন্দ্র আর লেনিনেরও নাম লেখা তাতে;
জিজ্ঞাসা করলাম, কী করবেন এই খাতা নিয়ে?
বলল, কবর খুঁড়েছি, সেখানে শুইয়ে দেব গিয়ে
অধিক কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করলাম, কার কবর, কোনো প্রিয়জনের?
লোকটি ব্যথিত দুই চোখ তুলে উত্তর দিল, হ্যাঁ, গণতন্ত্রের।।





হেমন্ত
      
শি খা  দ ত্ত
 
 চরাচর জুড়ে ছড়ানো গোলাপি আলো 

কখনো পোখরাজ রং; কখনো বা মেরুন 


মৃদু পায়ে নামছে হেমন্ত।

মরা বিকেল, ব্রোঞ্জ রঙের প্রজাপতি এসে জড়ো হয়;
দিনের শেষে গাছগাছালির ফিসফিসানি 

নিঝুম ডানায় গলে যাচ্ছে সম্পর্কের হিম।

পলেস্তারা খসা প্রাচীরের গায়ে মরছে ধরা পাতায় 

ঘন হয়ে নেমে আসছে প্রতিপদের চাঁদ। 

মিহি কুয়াশায় নাগরিক হাওয়ায় মিশে 

ধোঁয়াটে মশারির মতো ঝুলতে থাকে। 

আর ঠিক এই সময়ে বন ফায়ারের আলোয় 

নেচে ওঠে একদল বাউন্ডুলে ছেলে-মেয়ে।





আকাশের আয়নায়

তু ষা র  ভ ট্টা চা ৰ্য 

 হেমন্তের বাতিঘর শূন্য পড়ে আছে
আমি সেখানে রাত্রির পোস্টম্যান
হয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে আসি
আলোর পিদিম;
 হিম জোছনা ভেজা বাতাসে ভেসে
আসে নবান্নের নতুন চালের ঘ্রাণ; 
নিকোনো মাটির উঠোনে অনাদরে 
পড়ে থাকে অচেনা কার 
আলতা পায়ের চিহ্ন;
 ব্যর্থ বাউল প্রেমিক আমি সারারাত
খুঁজি তার মুখ প্রান্তরে পাকা ধানের মাঠে
 আলপথে
 ওই দূরের নীলিম আকাশের আয়নায়।





মাঝে মাঝে

প্র তী ক  মি ত্র

মাঝে মাঝে মানে যখন
দেখি হিসেব মেলে না মোটে এবং
যখন বুঝি দিনের বেলাতেই
নেমেছে অন্ধকার
আর সেই অন্ধকার ঢুকে পড়েছে
মনের ভেতরে
তখন ঠিক তখনই মনে করার চেষ্টা করি
আলমারিতে লাগিয়ে রাখা
মোটা বেড়ালটার ছবিটা। 
বেড়ালটার ছবিটা ভাগ্যিস ডাউনলোড করেছিলাম। 
হাতে আঁকা ছবিতে বেড়ালটা 
দু'চোখ বুজে শুধু হাসে। 
তার গোটা অস্তিত্বে
অদ্ভুত এক দার্শনিক নির্লিপ্ততা।
তারপর দেখি ক্রমে অন্ত্যমিলগুলো ফিরে আসে।
তারপর ভাবি চোখ বুজে একটু 
হেসে দিলেই হল।





মান্দাস
  
লা ব ণী  পা ল 

শব্দিত মান্দাস ভাসে...

তিরতির বয়ে চলা সুখ,
জাল পাতা সরু জল ঘিরে 
ঝুপঝাপ ওঠে নামে বাঁশ।
মাছরাঙা ডানা ঝাপটায়।

টুপটাপ কুয়াশার ডুব,
বালি জানে আদুল মানুষ।
শনশন বয়ে যায় হাওয়া 
খসে পড়ে মাটি, ফুল, গান।

শব্দিত মান্দাস বুকে 
নদী বাঁকে দূর দেশ ছুঁতে!





জীবন বদলে গেছে

চ ন্দ ন  দা শ গু প্ত

ছোট ছোট সব খুপরির মাঝে কাটছে জীবন,
আলো-হাওয়া নেই, নেই আকাশের দেখা,
বছরে কয়েকটা দিন, জানালার ফাঁক গলে,
হয়তো লজ্জায় উঁকি মারে,
এক চিলতে রোদ,
জানালার পাশেই টবে হয়ত থাকে,
রোগা একটা বেলিফুলের গাছ,
ঘরের জায়গা বাড়াতে গিয়ে,
ব্যালকনিটাকে খুন করা হয়েছে বহু আগে,
এখন ভুলেই গেছি, ঐ ব্যালকনি থেকেই,
রোজ ওড়াতাম হাতে তৈরি কাগজের ঘুড়ি,
ঝুঁকে পড়ে প্রতিদিন দেখতাম,
নিচের গলিতে ছেলেদের ডাংগুলি,
আর বাচ্চা মেয়েদের কিৎ-কিৎ-এক্কা-দোক্কা খেলা,
এখন আর গলিটাই নেই,
সব নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে,
দেড়ফুট দূরেই যে তৈরি হয়েছে,
আরো একটা খুপরি-ওয়ালা বহুতল,
ওয়ান-টু বিএইচকে-র কচকচানি,
আর কার্পেট-এরিয়া... প্লিন্থ-এরিয়ার হিসেব,
কবে যেন গোলমাল হয়ে গেছে,
নগরায়ণ হচ্ছে হোক...
আমি আজ শুধু এক বিষণ্ণ স্মৃতি হাতড়ানো দর্শক, 
জানি, এখন আর কেউ খেলাধুলোই করেনা,
এখন সবাই যে মোবাইল প্লেয়ার!





ভাগ্যের পরিহাস

মোঃ  আ ব্দু ল  র হ মা ন 

কুয়াশারা হেমন্তের চাকা ঘুরিয়ে 
শীতকে ডেকে আনে 
ফাগুন চোখে আমি স্বপ্ন দেখি তবুও বসন্তের 
কিন্তু ভাগ্যের তীক্ষ্ণ নখ হঠাৎ আঁচড় কাটে কপালে 
অতঃপর পাল্টে যায় রঙিন মুহূর্তরা 
বাতাসে কেবল ঘুরপাক ধূসর ধোঁয়া 
তবে কি আমি অভাগা?
চোখে বসন্ত ছুঁয়ে গেলেও 
কপালে ঘোলাটে কুয়াশার শিশির বাসর সাজায় 
যতই মুছি ততই ঔজ্জ্বল্য বাড়ে 
কিন্তু কালো দাগ কিছুতেই মোছা যায় না!
পরিশেষে বুঝলাম 
রং মাখলেও পৃথিবী সবার জন্য রঙিন নয়!
চলার পথটি সুসজ্জিত হলেও 
কেবল আমার ভাগ্যের চাকায় পেরেক গাঁথা
প্রত্যেহ পাঙ্কচার আর ব্লাস্ট হতেই থাকে 
মেরামতির কাজ চলতেই থাকে
ভাঙা ভাঙা গোধূলি লগ্নে
বিবর্ণতার নোনা জল ছুঁয়ে যায় চোখে কোণে 
ছেঁড়া ছেঁড়া রেটিনা তবুও বারবার 
ভাঙা চোরা স্বপ্নকেই জোড়া লাগাতে চায়...





দীঘি

তা প স  মা ই তি

বেলা পড়ে এল।
দিঘির জলে ঢেউ তুলছে মাথা
কিছু কথা নিয়ে তার দৌড়...
সূচি নামের মেয়ে পাড়ে বসে
দেখছে--- তার চলার ঢঙ

পাশে বনতুলসির ঝাড়
সূর্যাস্ত কিরণে বাহারি রঙের মেলা,
করছে খেলা

মেয়েটির পায়ে পায়ে
সমস্ত দিঘির সৌন্দর্য হাঁটছে
নিয়ে সন্ধ্যা চাঁদের আলো।





বসন্ত

সা য় ন্ত ন  ঘো ষ

শীতের হিমেল হাওয়া বইছে দিকে দিকে
বিষণ্নতা ধরা দেয় গাছের শুকনো পাতায়,
একে একে ঝরে যায় প্রাণহীন রঙ
অবসাদ লেখা থাকে জীবনের খাতায়।

সবুজের সমারোহ হয়ে আসে ফিকে
বিষাদ ভরা এই বেদনার সংসার,
এক ফালি আশা তবু হাতছানি দেয়
চেয়ে দেখি মহীরুহ সবুজের সমাহার।

পর্নমোচী তুমি, নও স্থায়ী মৃত,
চিরহরিৎ লুকিয়ে তোমার অভ্যন্তরে;
ব্যর্থ হয়েও হবেনা আশাহত
ছড়িয়ে দাও হরিদ্বর্ণ যা আছে অন্তরে।

হাহাকার দূরে ঠেলে বসন্তের সুর
হাতছানি দেয় নব জন্মের গান,
তরুলতা ভরে ওঠে আনন্দে উৎসবে
মুছে যায় ঝরা পাতার জমে থাকা ম্লান।





কথা ছিল

পূ র্বা  দা স 

কথা ছিল তোমার সাথে হাঁটবো
বহু ক্রোশ একসাথে।
কোনো চিরহরিৎ দেবদারু পাইনের দেশে,
নুড়িপাথর, ঝরা পাতা, হলুদ বনের ধার ঘেঁষে।

আঁকাবাঁকা মেটে রাস্তা পেছনে ফেলে, 
বেহালা কাঁধে কোনো জলছবিতে রঙ ঢেলে
একটা খাঁ খাঁ রোদের দুপুরে 
তোমার সাথে হাঁটবো বহু ক্রোশ একসাথে।

কথা ছিল কোনো এক চাঁদের শহরে 
রাত ভোর ভিজবো জোনাকিদের ঘরে।
সাক্ষী থাকবে রডোডেনড্রন,
আর পাহাড়ের যত শ্বেতকাঞ্চন,

খোলা চুলে তুমি পরিয়ে দেবে হাইড্রেনজিয়া!
তেমনই তো কথা ছিল।
ক্রুশবিদ্ধ জীবন ফেলে ঘন নীল শাড়িতে আমি 
তোমার সাথে হাঁটবো বহু ক্রোশ একসাথে।

তবুও হঠাৎ মেঘ জমলো আঁচলে!
অযুত নিযুত এতগুলো বছরেও
পাথরের দেহে জন্ম নিল না কোনো ব্রহ্মকমল।

সুখের পথ পেছনে ফেলে মিশকালো আঁধারে
ডুবে যায় শব্দেরা,
তবু কথা রাখে ক’জন?
ভেজা অনুভূতির গলিপথ বেয়ে 
নিয়নের বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে আসে ক্রমশঃ মহানগরী।

চেনা প্রহরগুলো শুধু ফিরে আসে বারবার।
কি যে বলি ওদের!






ঠিক কতটা

দি শা  পা ল ন দা র 

অংক আর কবিতার মধ্যে ঠিক কতটা ছন্দমিল হলে 
সে ছাড়িয়ে যাবে সমস্ত শব্দভান্ডারের লুকোনো পুঁজি?
প্রত্যুষ আর প্রদোষের মধ্যে ঠিক কতটা বোঝাপড়া হলে 
ওরা মিলেমিশে গেরুয়ার প্রতীক হয়ে রেখে যাবে তারাদের আতসবাজি?

শব্দছক যদি না মেলে, যদি কুয়াশারা যায় পথ ভুলে 
গোপন দরজার চাবি হারিয়ে গেছে অতলে সেই কবে,
ঠিক কতটা প্রাগৈতিহাসিক কাল সাক্ষী রাখলে, অর্ণবের জীবনীখাতায় আগলে রাখা সেই চাবি খুঁজে পাওয়া যাবে?

বহুদিন হয়ে গেল খিল দেওয়া দরজার ওপাশে 
কান পেতে শুনি, শোকের ওজনের বেহিসেবী পরিমাপ,
ঝরাপাতারা ঝড় আগলে রেখে আবার নতুন হল,
ঠিক কতগুলো পাতা ওল্টালে মিলবে অভিমানের হিসাব?

মৃত ঘাসেরা রসদ নিংড়ে নেয় আলোর উস্কানি থেকে 
সে নিক, তাতে হিংসে করার পুরোনো অভ্যেসটা নেই আর 
তবে ঠিক কতটা ভালবাসতে পারলে তোমাকে, বলো,
ফুরিয়ে যাবে সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, ভালবাসার।





হিম

লা ল ন  চাঁ দ

হিম হিম সকাল 
শিশির ভেজা উঠোন 
মেঘ নেই
আবছা রোদ্দুর।

ওমে ওমে গর্জায় হৃদয় 
গিন্নিকে টানি 
বুকের ভেতর জ্বলন্ত আগুন।

হিমেল হওয়ার গন্ধ 
ইচ্ছেগুলো সমুদ্দুর 
ফসলের সুবাস সারা বাড়িময়
ঘরের কার্নিশে মায়া 
মায়ানগর।

জানালা খোলা 
উড়ে এসে ঘরে ঢোকে শীত 
স্যাঁতস্যাঁতে বিছানা 
ক্লান্ত দুপুর।

হিম মাখি দুজনে 
শীত শীত আমেজ 
বুকের ভেতর শীৎকার 
রাত আসে শেষ হয় না জনমভর।





জলে আমার মুখ দেখি
 
অ ন ন্ত  রা য় 

আমি খেলার জন্য বেছে নিয়েছি জল,
জলে আমার মুখ দেখি, 
পৃথিবীর মুখ দেখি, দেখি আমার অনন্ত শোক ,
অক্সিজেন ফুরিয়ে এলে আমাকে জারণ করে।

আমাকে নিয়ে যায় শেষ তীর্থস্থানে,
দৃশ্যে দৃশ্যে ভিনদেশীয় চূর্ণিত হরিয়ালের মেঘে—
তা ছাড়া কোথায় খেলবো?

দিকে দিকে গনগন করে বিস্ফোরিত এত উনুন।





প্রশ্নমালা

প্র দী প  শ র্ম্মা  স র কা র

গ্রন্থিটা খুলে গেল অসাবধানে–
আতরে ভেজানো রেশমী সুতোর বন্ধন ছিল, তবুও–,
অনবধানে ছন্দে সুরে ঘাটতি হ'ল না কি–
কি জানি!!
হেমন্তের গাম্ভীর্য সইতে পারোনি হয়তো–
সযত্নে আগলে রাখা আকাশপ্রদীপ
একলাফে আকাশের তারা হ'ল কার মহিমায়?
এখন শুধু প্রশ্নমালা রচনা করি,
যদিও বা নিরুত্তর তুমি।

কতদিন আর এই প্রশ্নমালা অগ্রাহ্য ক'রবে?
একদিন তো প্রশ্নগুলো বাতাসে উড়ে বেড়াবে–
তুমি পাখি হ'লেও ডানায় ঠোক্কর খাবে প্রশ্নজট।
মাছ হ'য়ে অতলে ডুব দেবে ভেবেছ?
দ্বিধাজর্জর প্রশ্নের আঁকশি জড়াতে আসবে,
কোথায় পালাবে?

হিমেল বাতাস এড়িয়ে এসো পানপাতার উষ্ণ আশ্রয়ে,
দুটি প্রাণ পরস্পরকে জড়িয়ে বাঁচুক
রাগসঙ্গীতের কাঠামোয় সুরের সুরভী মেখে।
ঋতু পরিবর্তনের সাথে সুরান্তর গায়নে।





আঁধার যাপন

জ বা  ভ ট্টা চা র্য

এই শান্ত, নির্জন রাস্তা দিয়েই
কোনো এক ব্রাহ্ম মুহূর্তে
বাবাকে নিয়ে ফুলে সাজানো
গাড়িটা চলে গিয়েছিল। 

তখন আমি স্পষ্ট 
রাস্তাটার কান্না শুনেছিলাম 
মায়ের হাহাকারের  মতো।

তারপর থেকে,
বাবার হারিয়ে যাওয়া পথ ধরে
মা আর আমি বারবার  হেঁটে গিয়েছি
রোদ ঝলমল, বৃষ্টি ধোয়া,  হাওয়াসচল
রাস্তা দেখার নেশায় বুঁদ হয়ে।

                   পাইনি

দিনমানেও, রাস্তাটা জুড়ে এক অদ্ভুত  আঁধার যাপন।





লাশ

নি র্মা ল্য  ঘো ষ 

বাসের চাকার সঙ্গে গড়িয়ে গড়িয়ে 
দুপুর চলেছে বিকেলের দিকে।
বাসে একাকী আমি...
সময় গিলে চলেছি ক্রমাগত...
একটি মুহুর্ত থেকে আরেকটি...
ক্রমশঃ... ক্রমাগত...
একটা শকুন দেখে চলেছে 
বহুক্ষণ ধরে 
জীবন্ত এই লাশটিকে।
ও জানে না 
ঘুমন্ত কে ওঠানো যায়...
কিন্ত ঘুমের অভিনয়কারীকে
কখনো ওঠানো যায় না।
সে একটা লাশের থেকেও অনেক 
বেশি মৃত... অনেক বেশি বিস্বাদ।
কিম্বা ভয়াবহ।

ভালোবাসা বাস করে মস্তিষ্কে। হৃদয়ে নয়।






মাতা পুত্রের কথা

সু ত পা  চ ক্র ব র্তী 

রাক্ষসী মাতা তুই
একটু একটু করে গিলে খাচ্ছিস আপন পুত্রকে
তোর লাজ নাই পোড়ারমুখী? 
তোর পুত্র অন্নহীন, তোর পুত্র চাকুরিহীন হয়ে 
পথে পথে চক্রাকারে ঘুরছে 
তুই আবাগির বেটি, মহানন্দে বসে রাজার বাড়ির ভোজ
গিলছিস, মাতা?





তুমি

উ প ম ন্যু  মু খা র্জি 

যে কথা হয়নি বলা বলবো তা আজ,
আর কত বয়ে যাবো! যদি নামে সাঁঝ!

হৃদয় গহিনে পোষা যতটা তিয়াস,
ঢালবো তোমার প্রেমে বাঁধি অভিলাষ। 

যে চোখে হয়নি দেখা সেই চোখ খুলে, 
দেখে নেবো চেখে নেবো রাখবো না তুলে।

চোখেতে ফাগুন যদি দেখে ফেলি আজ,
কী হবে হৃদয়ে পুষে এতো হায়া লাজ! 

ফাগুনের শুরুতেই দেখে নিয়ে সব
শুনে নিতে হয় যত হৃদ কলরব।

বয়ে গেলে বেলা তবে যেতে পারে ছুটে, 
লালিত স্বপ্ন যত যেতে পারে লুটে।

যে কথা বলিনি কভু শোনো তবে বলি,
গোপন নিবাসে দোলে তুমিময় কলি!





নিঃসঙ্গ দুটি হাত

দী প ঙ্ক র  রা য়

তোমাদের কাছে যেয়েও 
লুকিয়ে নিই নিজের মুখ 
কেন জানি মনে হয় অপাঙ্ক্তেয় 
অহেতুক কৃপা দৃষ্টি ভিক্ষা করে ফিরি?

যে আমায় নিয়ে যায় 
সেও নেয় না সঙ্গে 
যে আসবে বলে কথা দেয় 
সেও আসে নিজেকে রেখে 
আমি কার দুটি হাত ধরে 
মেলার মাঠে হারিয়ে খুঁজবো নিজেকে?

মেলা তো মেলাই 
কোথাও কেউ নিজেকে খুঁজতে এখানে আসে না 
নির্ণিমেষ চেয়ে থাকে গ্রন্থের ভারে অগ্রন্থিত কবির মুখটি  
করুন চোখে 
বেচাকেনা দরদামের মাঝে 
লুকিয়ে সরিয়ে নিই 
যে হাতে কানাকড়ির ভরসাও নেই;

বিশ্বাসে অবিশ্বাসে সেও সঠিক চিনেছে বলে লুকিয়ে পড়ে, নিঃসঙ্গ  দুটি হাত ছুঁয়েই----





দীপ

শ ম্পা  সা ম ন্ত

গাছের পাতাগুলো ভরে রাখছে আলো।
ঝুলে আছে রোদের হিলিয়াম গুচ্ছ 
এভাবেই কোয়ান্টাম পৃথিবীতে নুইয়ে পড়ছে প্রণামের ভঙ্গি
রোদেলা বিকেল সরে গেলে গোধুলি নামে হলুদ বর্ণের
সমস্ত রঙ মেখে নিচ্ছে পশ্চিমের আরশি
যেন নিকোনো উঠোনের কোনায় একমুঠো জোনাকির দীপ





কষ্ট

শ ম্পা  সা ম ন্ত

প্রতিদিন কষ্টেরা পোশাক পালটায়
সুখের পাখিরা ভোর হলেই উড়তে থাকে এদিক ওদিক
আমার বিস্তৃত ডালে বসেনা কোথাও
নিরন্তর আশায় জাগি নীরব রাত
আর প্রতিদিন ঘুম ছিঁড়ে ব্যথা উঠে আসে গণ্ডনালি বেয়ে
সেই যে এক নদীর বাহিত স্রোতে নৌকা বাইলাম
মোহন অঙ্গুলি রাখলাম সমৃদ্ধ বাঁশিতে
কোথাও একটা  জুৎসই সুর বেজে উঠবে বলে
গানের নির্দিষ্ট গুরু নেই
সুর চুরি করে জড়িয়ে নিচ্ছি কণ্ঠে
ভাঙা বাঁশির মতো বেসুরো
কতকাল গানবাড়ি যাইনি
কতকাল মাচানে বসে আকণ্ঠ পান করিনি সুধারস
সেই দুপুরের গাছতলায় বসে গল্পের গরুগুলো বিশ্রাম নিচ্ছে
আমার ভাগ্যকে দোষ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি কতক্ষণ
আমাকে আর পথভুলে ডেকোনা সমাজের কাছে
বকুল তলায় পুঁতে রেখে চোখের জল।





দামোদর মাস
    
অ নি ন্দি তা  না থ

কার্তিকের সন্ধ্যা একটু 
ধীর-স্থির হয়। 
হালকা হিমেল বাতাস বয়। 
কার্তিক মাস- সে যে দামোদর।
এক বিশেষ প্রথা 
বিধি-নিয়মে বাঁধা। 
আজও প্রচলিত এ কথা। 
পূর্ব-পুরুষদের জন্য আত্মার 
      শান্তি কামনায়
"আকাশ প্রদীপ" দান। 
বহ যুগ ধরে গুরুজনদের 
জানায় সম্মান। 

  



বারাণসী
 
অ নি ন্দি তা  না থ
 
প্রাচীন বারাণসী পবিত্র শহর, 
শিবের লীলা ভূমি, হাজার মন্দির  
স্তোতস্বিনী গঙ্গা বহে অবিরাম। 
ঘাটগুলোর আছে বিশেষ নাম। 
স্তোত্র পাঠে সন্ধ্যা আরতি, 
সব প্রদীপ একবৃত্তে প্রজ্জ্বলিত। 
অলি-গলির প্রতি ইঁটে, 
ইতিহাসের কথা মালা। 
পুণ্য তীর্থে ঘোরে 
জীবনের অন্য বেলা। 
মার্ক টোয়েন বলেছেন -
"ইতিহাসের চেয়েও প্রচীন"।
কিংবদন্তির থেকেও শহর
     আজও অমিল।





অযোধ্যা- ১৩

ক ল্পো ত্ত ম

পাতারা সবুজ হলে অযোধ্যা সবুজ 
পাতারা হলুদ হলে অযোধ্যা হলুদ 
তেমনই নীলচে, খয়েরী, বাদামি।

রং পাল্টাতে পাল্টাতে 
বহুরূপী সে।

তোমরা তার মিথ ভেঙেছো,
অবিশ্বাস করেছো 
শাল পাতায় ঝুলে থাকা সীতার চুল,
আর্টেজিও কূপ বলেছো সীতাকুণ্ডকে,
তোমাদের সারি সারি ঘর 
অযোধ্যাকেও করে তুলবে নগর।

হাতিরা নাগরিক হবে,
নাগরিক হবে শেয়াল, বন্য শূকরেরাও?





অযোধ্যা- ১৪

ক ল্পো ত্ত ম

চারপাশে বাঁকা ডহর 
চারপাশে শব্দ সঞ্চারণ, যানবাহনের,
লোক আসে লোক যায়,
মাটির ঘরে খুঁজে ফেরে এটাচড বাথরুম 
এসি থেকে নির্গত হাওয়া।
শৃগাল-ভল্লুক, বাঘ-হাতি, খরগোশ-বানর
বন্য শূকর, পাখি, অথবা সরীসৃপ 
শান্তি খুঁজে, মাথা পটকায় 
চাটানে চাটানে।

তোমরা থাকতে এলে 
পাহাড়ের গুহায় গুহায় 
কোথায় নিরালা?
কোথায় পায়ের ছাপ পড়বে তাদের?





শীতে লেখা চিঠি

 তৈ মু র  খা ন

রোদ্দুরের মই বেয়ে আমিও আকাশে উঠি
 তরুণ সূর্যের গান গাই
 তাপ ও অনুতাপ রচনা করে গানের স্বরলিপি
 যদিও কুয়াশা সমাচার
  অস্পষ্ট সাম্রাজ্য বিস্তার করে দিকে দিকে
 আমি তবু হাত দেখাই আমার অনন্তকে
 হাতের সংকেতে মেঘ সোনালি বর্ণ পায়
 যদিও শীতের তাঁবু  জবুথবু কম্পিত কলেবর
 তবুও সৈনিক আমি স্বপ্নের দুর্গ বানাই 
  পুনরায় নতুন বাঁচার
 বরফ হৃদয়গুলি মৃতের মতন শুয়ে থাকে
 উষ্ণতা তাদের ছোঁয় না কখনও
 তাদের ডাকে না কোনও পাখি
 ক্লান্তির পরশে আলো নিভে যায়
 এই শীতে একটিই চিঠি লিখি রোজ
 আমার অনাগত বসন্তকে





স্বাগত

তৈ মু র  খা ন 

আমাদের উপসর্গগুলি
কোনও আলোকময় জাদুঘরের
করিডোর ধরে দাঁড়িয়ে আছে
সন্তান প্রসবের কাল পেরিয়ে গেলেও
উপসর্গগুলির কোনও হাসি শোনা গেল না

উঠোনে রোদ্দুর এল
রোদ্দুরে পাখি নামল
আমাদের কোমল ব্যর্থতাগুলি
চুপচাপ বসে পড়ল দাওয়ায়

মৃন্ময়ীর মুখ মনে করে
আশ্বিন মাসের ফিরে আসার আভাস এল
উপসর্গগুলি আমাদের অন্তর্গত ধ্বনিময় বাজনার হ্রদে
হয়তো ফুটে উঠবে একদিন

আমরা বিশ্বাস নিয়ে নিকানো উঠোনে নেমে দাঁড়ালাম






কোথাও আছে কি কেউ

উ ত্ত ম  কু মা র  দা স 

মনুষ্যত্ব হারিয়ে... মানুষ মাপছে, মাটি
মাটি পুড়ে হয় ইট পাটকেল 
সোনার চেয়েও খাঁটি 

পড়ে আছে আজ মানুষ, পথের কিনারে! খোঁজ 
দল ভেঙে গেলে হয় শত্রু 
জন জোয়ারে রোজ

দাঁড়িয়ে দেখছে মৃত্যু, জীবন মারছে রাগে 
হিংসা জিতছে বিদ্বেষ মোহ 
খিদের পৃথিবী আগে 

জীবন যুদ্ধে হেরে যায় বীর, মৃত্যু মিছিলে আজ 
দেশ মরে আজ লজ্জায়... ভেঙে 
দল বাজি বড় কাজ 

সব শেষ সব শেষ তবু, বাঁচিয়ে রেখেছি ঢেউ
মানুষের হাতে মানুষ মরছে 
কোথাও আছি কি কেউ?





পচন ধরেছে সমাজের বুকে

উ ত্ত ম  কু মা র  দা স 

হিংস্র খুঁখার জানোয়ার আজ মানুষের নাম নিয়ে 
মারছে, কাটছে আঘাত করছে 
দেশের সামনে গিয়ে 

কেউ নেই আজ, কেউ নেই কেন? কাঁটাতার ঘেরা বুকে 
ওদেরও রক্ত এক-দেশ-মাটি
ভাগ করে জাত ঠুকে

মানুষ গড়েছে ধর্ম দেবতার ইষ্ট-খৃষ্ট পীর 
কাজই ধর্ম, সেবাই কর্ম
মানুষ! সে বড় বীর 

গাঁজা হত্যা, ইরাক-ইরান সভ্যতা বড় রোগ 
সবটা হচ্ছে বিয়োগ অংকে 
হচ্ছে না গুণ-যোগ

পৃথিবী মরছে মানুষের পাপে, মানুষ শক্তিমান 
সভ্য সমাজ দাঁড়িয়ে দেখছে 
মন্দিরে ভগবান 

পচন ধরেছে সমাজের বুকে, ন্যায্য বিচার কই 
অস্ত্র যেখানে কথা বলে আজ 
শিশু পাঠ্যতে বই...





চাঁদ

প ম্পি  তা লু ক দা র

মোদের দেখা হয়,শুক্ল শুক্লপক্ষের রাতের বেলা,

  অন্য দিনগুলোতে আমি বড্ড একলা। 

অনেক রাত, পার হয়ে যায়, তোমার প্রতীক্ষায়,

হৃদয়ে জমতে থাকে, অব্যক্ত কথার ব্যাথায়।

 বিষন্ন মনে,কত কথা বলি তোমার সনে,

তবুও আমায় জড়িয়ে রাখো, শুভ্রতার আলিঙ্গনে।

 তোমার নেই বিরক্তি,নেই গ্লানি, আছে শুধু সৌন্দর্যের মুগ্ধতা,

তোমায় নিয়ে, কত কবি লিখে, প্রেমের কবিতা।

 শূন্যদৃষ্টিতে  তুমি আমার সব কথা শোনো সংগোপনে, 

 মন্ত্রনা দাও, না বলা কথাগুলিকে- কিভাবে চেপে রাখতে হয় হৃদয় কোনে?

আমি যখন জিজ্ঞেস করি তুমি একলা কি করে থাকো ঐ দূরদেশে?

 তুমি  হয়তো বলো- মূল্যহীনতা,অবহেলার চেয়ে,আমি বেশ আছি,একাকীত্বকে ভালোবেসে,

যুগ যুগ ধরে,আমি শুনেছি-কত যন্ত্রণাময় কান্না।

 তাইতো আমি -কারোও কাছে থাকার অধিকারবোধ আর চাইনা,

 সময়ের স্রোতে আমি ভেসে বেড়ায় নিজ মনে।

আলো ছড়ালে, সকলের প্রিয় হওয়া যায়,

 তবে প্রিয়তমা হয়ে,বন্দী হতে চাই না কারোও খাঁচায়।






স্ট্রিটলাইট

প ম্পি  তা লু ক দা র 


দীর্ঘ পনেরো বছর হলো-

 তুমি দাঁড়িয়ে  আছো পথের কোণে,

 আজ হঠাৎ দেশে ফিরে -

 তোমার সঙ্গে আবার দেখা হলো।

তুমি জানতে চাইলে -

কেমন আছো তোমরা?

 পুরনো স্মৃতির পাতায়-

আবার দেখা হলো দুজনা'র,

 ফিরে গেলাম -

আগের ফোনের গ্যালারিতে।

 খোলা চুল ,হাতে হাত-

 হেঁটে চলেছি দুজনে।

গন্তব্যের আগেই থেমে গেলাম,

 ফ্রেঞ্চ- ফ্রাই ,আর কফির কাপে -

  চুমুক দিতে দিতে রাত ন'টা।

 স্ট্রিটলাইটের আলোয় ঝাপসা একটা সেলফি,

 মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটাকে-

 অনেক উজ্জ্বল করার চেষ্টা করেছিলাম।

কিন্তু সেলফিটা-

 পরিস্কার হয়ে ধরা দিল না আমার গ্যালারিতে,

 তাই একটা আইফোনের -

 নেশায়  মত্ত হয়ে উঠলাম ।

ফুটপাথের স্টিটলাইটের আলোয় -

হেঁটে চললাম বছরের পর বছর,

আজ নতুন আইফোনের-

 সেলফিতে আমি আর সেই স্ট্রিটলাইট।





রক্ত ভেজা ফুলের পাপড়ি

আ ল তা ফ  হো সে ন  উ জ্জ্ব ল 

অনুভূতির স্বচ্ছ নর্দমা থেকে
উঠে আসে তোমার নরম আঙুলের ছায়া।
হৃদয়গুলো ধীরে ধীরে ফুলে ওঠে
জলধারার মতো নরম,
অবচেতন ঘাসে শিশিরবিন্দুর মতো
নীরব শব্দে।

রক্তভেজা ফুলের পাপড়ি
যেন হঠাৎই আলো ধরে—
ফেঁপে ওঠা ঢোলের মতো তীক্ষ্ণ ছন্দ,
যেখানে প্রতিটি স্পন্দন তোমার নামে
জেগে থাকা এক বিস্ময়।

ছোঁয়ারা তখন
অস্পষ্ট আকাশের বুকে
বিচিত্র উপাদানের নক্ষত্র হয়ে
ফুলে ফেঁপে জ্বলে ওঠে—
অদৃশ্য কোন শক্তি যেন
আমাদের ঠোঁটের কাছে
একটি প্রাচীন মন্ত্র রেখে যায়।

বৈদিক যুগের আগুন
এখনও আমার ভেতরে ধাবিত—
যেখানে তুমি
একটি অর্ঘ্য হয়ে ওঠো
আমার সমস্ত প্রার্থনার কেন্দ্রে।

এভাবেই আমরা—
স্বচ্ছ অনুভূতির অন্ধকার জল থেকে উঠে
আবার জন্ম নেব,
প্রতিবার ছুঁই,
প্রতিবার দগ্ধ হই,
প্রতিবারই নতুন আলোয়
রোমান্টিক আগুনের ভিতর
নিজেদের খুঁজে পাই।





তুমি নেবুলার ছায়া

আ ল তা ফ  হো সে ন  উ জ্জ্ব ল 

তার হৃদয় ছিল সমদ্বিত—
এক পাশে তারার নরম আলো,
অন্য পাশে গভীর নেবুলার ছায়া;
দু’দিকেই একই সত্যের দীপ্ত প্রতিফলন—
ভালবাসা কখনো একমুখী নয়,
সে জন্মায় দ্বিমাত্রিক বিস্ময়ে।

সমদ্বিত সেই প্রতিধ্বনিতে
তার কণ্ঠস্বর যেন ভেসে এলো
রহস্যের নীল সুরে—
এক মুহূর্তে সে দূর, পরমুহূর্তে কাছে,
যেন ভালোবাসার নিজস্ব মহাকর্ষ।

আমি মেঘবন উত্তরের অভিযাত্রী—
মৃদুমন্দ সমীরণের মতো কোমল,
তবুও হৃদয়ে ঝড়ে ওঠা
এক অদৃশ্য বিপ্লবের স্রোত বহন করি।
হৃদয়ের স্বপ্ন-গাথা,
অস্পন্দিত অজানা জ্ঞান,
অস্পর্শের দীপ্ত আলোকছায়ায়
তোমার অস্তিত্ব হোক দীপ্তিমান—
তুমি আলো হলে উদ্ভাসিত,
ছায়া হলে গভীর রহস্যময়।

কারণ তুমি যেভাবেই আসো—
আলো হয়ে, অন্ধকার হয়ে,
দূরের ধ্বনি হয়ে বা নিকটের নিঃশ্বাস—
আমি সর্বদা বহন করি
তোমার চিরঞ্জিত রক্তের উষ্ণ অনুরণন,
তোমার নামের সুরে নরম দ্যোতনা,
সাত কাহণ দূরের প্রেমের লাল-উচ্ছ্বাস।

তোমার ছায়া আমার বুকে ঢেউ তোলে,
তোমার আলো আমার মনোজগতে নক্ষত্র জ্বালায়।
তোমার অনুপস্থিতির মধ্যেও
তোমার উপস্থিতি আমাকে দহন করে—
এক রোমাঞ্চ,
এক চঞ্চল মধুময়তা,
এক অতল গভীর অনুভব হয়ে।

তুমি থাকো, তুমি না থাকো—
আমি তোমাকেই লিখে যাই
হৃদয়ের গোপন নক্ষত্রখাতায়,
এক অতল প্রেমের ভাষায়।





অযাচিত ব্যবধান

বি বে কা ন ন্দ  ন স্ক র
 
সব সময় সে কাছে থাকে
পাশে থাকে
আগের মতোই
কিন্তু আমি বেশ জানি
সে আর আগের মতো নেই।
তার আর আমার মধ্যে 
অনেকখানি দূরত্ব।

কোন বিদ্বেষ নেই 
বিরহ, উপেক্ষা বা তাচ্ছিল্য
উপলব্ধিতে ধরা পড়ে না কিছুই 
তবু সে ক্রমশঃ সরে সরে যায় 
একেবারে নাগালের বাইরে।

ঠিক জানি একদিন তাকে 
চাইলে ও আর পাবো না 
হারানো শব্দটাই সেদিন হারিয়ে যাবে 
কারণ সেদিন আমি একেবারেই 
হেরে বসে আছি।





পরম প্রাপ্তি

বি বে কা ন ন্দ  ন স্ক র
 
ঢেউ জানে ভাঙনের ব্যথা 
তবু সে আঘাত করে 
যদি ক্ষয়ে যাওয়া প্রেম কিছু কথা বলে।

শুকনো নদীর চরে
হতভাগ্য বালুচর 
মৃত্যু উপাখ্যানের আহত স্বর।

নদীর মতো জীবন চেয়েছিলো
একেবারে আটপৌরে মানবিক সুখ
অপরাহ্ন আলোর নত মুখ।

দেওয়ালে পিঠ রেখে 
নৈমিত্তিক যাপন যুদ্ধ শেষে বুঝেছি 
পরাজয় ও এক পরম প্রাপ্তি।

ক্ষয়িষ্ণু সময় ফেলে চলো অন্যলোকে
অন্যভাবে যদি আবার শুরু করা যায় 
অন্যভাবেই যদি তোমাকে কাছে পাওয়া যায়।





হারিয়ে যাওয়া
 
বি ক্র ম  ম ন্ড ল 

নিভে যাওয়া দিনশেষের রক্তাভ আলোয়
আজও দেখি তোমার মুখের ক্ষীণ ছায়া;
হিম শূন্যতার বুক ছিঁড়ে ওঠে দীর্ঘশ্বাস,
যেন দিগন্ত জুড়ে কার অশ্রুস্রোত বয়ে যায়।

স্মৃতির গহন অরণ্যে ঘুরে ফিরি একাকী—
তোমার পদচিহ্নের মোহে পথ হারায় মন;
নিস্তব্ধ রাতের আড়ালে কেউ যেন ডাকে,
তোমারই নাম, তোমারই স্নিগ্ধ ছায়ার মতো।

কতকাল এ হৃদয় বহন করে জ্বালা—
হারিয়ে যাওয়া প্রেমের প্রতিটি ধূপছায়া;
চাঁদের ক্লান্ত রূপও আজ তীব্র দগ্ধ মনে,
তোমার অনুপস্থিতির শোক জ্বালায় আরও।

আকাশের শূন্য দিগন্তে ঝুলে উঁকি দেয় প্রশ্ন,
মানুষ কি সত্যিই এভাবে ফেলে যায় আপনজন?
নাকি এ জীবনে সবই শুধু ক্ষণিক বাতাস—
এসে ছুঁয়ে যায়, তারপর হারায় দূর আকাশে।

তবু বিরহের কালো অগ্নিতে জ্বলে ওঠে
তোমারই স্মৃতি— শল্য হয়ে হৃদয়ে বিধে;
আমি নিথর পথিক, তবু এগিয়ে যাই ধীরে,
তোমারই অভাব বুকে, অন্তিম প্রদীপ হয়ে।





এক আকাশের নীচে

বি ক্র ম  ম ন্ড ল 

মানুষ জন্মায় মানুষ হিসেবেই,
মাটির ঘ্রাণ, নদীর স্রোত, আকাশের আলো—
সবাইকে সমান ছুঁয়ে যায়।
তবু কারা যেন অন্ধকারের শপথ নিয়ে
ভাগ করে দেয় নাম, রঙ, প্রার্থনার ভঙ্গি।
তারা বলে— তুমি হিন্দু,
তুমি মুসলিম-জৈন-খ্রিস্টান
যেন রক্তের রঙে ভেদরেখা আছে!
যেন কান্নার ধ্বনিতে আলাদা ভাষা আছে!

রাজনীতি 'ছদ্মবেশী শয়তান'
ধর্মকে বানায় তার হাতিয়ার—
মৃত্যুর মিছিল, ঘৃণার আগুন
তারই খেলায় দাউ দাউ জ্বলে ওঠে।
কিন্তু আমি দেখি—
শিশুরা একসাথে কাঁচা মাঠে দৌড়ায়,
একই কূপ থেকে জল তুলে আনে,
একই আকাশে ঘুড়ি ওড়ায়।
সেই আকাশে কি লেখা থাকে—
এই মেঘ শুধু হিন্দুর,
ওই রোদ্দুর শুধু মুসলিমের?
না, আকাশ একটাই।
মানুষও একটাই।
একই বাতাস ছুঁয়ে যায় আমাদের,
একই সূর্য আলো দেয়।

তাই যারা ভেদরেখা টানে,
তাদের বিরুদ্ধে আমার কবিতার আগুন,
আমার কলমের বজ্রধ্বনি—
ঘোষণা করুক—
ধর্ম নয়, মানুষই প্রথম সত্য।
আর মনুষত্বই পরম ধর্ম।





পৌষ সংক্রান্তি

দে ব যা নী  দা স

পৌষ মাস শীতকাল গাল ভরা এই নাম

খাওয়া দাওয়া ভরপুর পেট ফুলে একাকার

পিঠে পুলি পায়েস খেয়ে করো আয়েস

ক্ষীরপুলি, চন্দ্রপুলি পাঠিসাপ্টা, মালপোয়া, ভাঁপে পিঠা, দুধপুলি
ক্ষীর আছে সওয়া সওয়া
 চিড়ের পিঠা, ডালের পিঠা, সাবুর পিঠা আলুর পিঠা সুজির পিঠা, বকফুল
ক্ষীর দিবে না নারকোল 
চিনির সিরায় ফুলে ফেঁপে
মুখে দিলেই গলে যাবে
 চালের পায়েস, গাজরের পায়েস
সেওয়াই পায়েস, সুজির পায়েস 
পায়েস দেখ হরেক রকম

তিন রকম পাটিসাপটা ক্ষীর, নাড়কেল আর তিল 

খেতে মজা ক্ষীরে ভিজিয়ে
 এ তো গেলো পিঠে পায়েস নাডু সন্দেশ আর কত কি ?
নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু,
 চিড়ের মোয়া, খৈ এর মোয়া মুড়ির মোয়া আর ক্ষীরের মোয়া 
পাত পেড়ে হচ্ছে খাওয়া 
ভোগালী বিহুর বিরুনচাল
 আর নলেন গুড়ের সন্দেশ

খেজুর পায়েস তিলের বড়া 
চলতে থাকে পিঠের রেশ

দারুন এসব খাওয়া নিয়ে বাঙালীর উৎসব হয় না শেষ
 নামগুলো সব মনে রেখো
আগামী দিনের বাঙালী প্রজন্ম বাঁচিয়ে রেখো বাঙালীকে 
এই অনুরোধ তোমাদের 
পৌষ পার্বণের উৎসবেতে।





তুমি সব পারো

দে ব যা নী  দা স

ইতিহাস সাক্ষী আছে— তুমি সব পারো 
তুমি ভাঙ্গতে পারো— তুমি গড়তে পারো

তুমি সৃষ্টিকে পৃথিবীতে আনতে পারো 
তুমি উত্তপ্ত পরিবেশ শান্ত করতে পারো

আবার সংসারের লেলিহান আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারো 
তোমার রাগ নেই, তোমার ক্ষোভ নেই,
 মান-অপমান বোধ নেই 
নেই কোনো অভিমান---
তোমার শব্দকোষে 'না' নেই 
তাই তুমি সব পারো---
তুমি রাতের পর রাত জেগে আমাদের ঘুম পারিয়ে দাও 
সবার মুখে অন্ন তুলে দিয়ে হাসিমুখে জলে নিজের পেট ভরিয়ে নাও
তোমার ঘুম নেই, তোমার বিশ্রাম নেই নেই তোমার ক্ষুধা, 
নেই তৃষ্ণা
তোমার এই কঠোর আত্মত্যাগে আমার জন্ম, আমার অস্তিত্ব।

তুমি সব সমস্যার সমাধান 
সব প্রশ্নের উত্তর তুমি।

সারাদিনের ক্লান্তির শীতল আশ্রয় তুমি 
তাই তো বলি তুমি সব পারো---

আমার সব রাগ যেন তোমার উপর ক্লান্তি ও অবসাদের ক্ষোভ তোমার উপর
 তুমি কিছুই জানো না, কিছুই বোঝো না 
তুমি অজ্ঞান এই দিই আমি তোমার প্রতিদান। 
কিন্তু তাও তুমি নীরব, নিস্পৃহ, ক্ষমাশীল---

হাসিমুখে আবারো তুমি সেবিকা রূপে---
একবার বলতে পারো— কি দিয়ে তৈরী তুমি 
ঈশ্বরের অনবদ্য সৃষ্টি তুমি
তাই তো তুমি সব পারো---

কারণ তুমি একজন 'মা'

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত উচ্চারিত একই শব্দ 'মা'





আনন্দ আশ্রম

ন ব কু মা র  মা ই তি

দুটো হাত ধরে বলেছিল সে
এইখানে বসো কিছুক্ষণ 
বিকেলের শেষ আলো আশাহীন
নিরুত্তাপ নিঃশব্দে অপসৃয়মান
ক্লান্ত, অবসন্ন, বেদনাবিধূর মনে হয়।
জীবনের অনেক নিগূঢ় সময় কাটিয়েছি
যার সাথে; সুখ দুঃখ কান্না হাসি
আজ বড় নস্টালজিক মনে হয় পশ্চাৎ সময়
হয়তো বা একা; সুনীল আকাশ, ছায়া সুনিবিড় শান্তির 
নীড়ে, চির বিচ্ছেদ মাঝে হবে কি গো শেষ দেখা?
প্রতীক্ষার মগ্নবেলা বড্ড বেশি বিলম্বের মনে হয়, যেন স্থিতপ্রজ্ঞ
অচল সময়। কলঙ্ক সয়েও জোছনা দান করে চাঁদ 
আষাঢ়ি মেঘ করে বারি বরিষণ ফুটিফাটা তৃষ্ণার্ত 
মাঠের বুকে, সে তো শুধু আপনার সুখে নয় 
ধরা ও ধূলির প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠায়।
আর কোন পিছু টান নয়, জীবনের পড়ন্তবেলায় 
ঝেড়ে ফেলে নিরালম্ব কামনা বাসনা, পরিত্যক্ত পার্থিব পটভূমি 
কেলেঘাই-এর স্থির জল, পাড়ের বৃক্ষলতা পাখির কূজন 
জেলে ডিঙ্গি, নিষ্পাপ শিশুর নদীজলে উল্লম্ফন 
পাইন, ঝাউ, দেবদারু দিকচক্রবালে আকাশ মাটি 
ও মায়ের পদচিহ্ন, তবু ঐহিকের শেষ আশা এই 
যদি কোন নীড় রচে হৃদয়ের তলে, আমি যুগান্তের কবি 
সেই হবে অক্ষয় আনন্দের শেষ আশ্রয়।





অনন্ত আলো
 
ন ব কু মা র  মা ই তি

আলোকলতা
মনে পড়ে তোমার সেদিনের কথা 
নিশ্চিন্তপুরের মাটি, রাতের আকাশে জ্যোৎস্নার আঁকিবুকি
তুমি ছিলে রোরুদ্যমান, অনিশ্চয়তায় শুকিয়ে কাঠ হয়েছিল
তোমার সুকোমল মুখ, কম্পমান গ্রীবা 
চরম সংশয়ের দোলাচলে অস্ফুটে বলেছিলে 
তোমায় আমি পাব তো, আপনার করে?
ঊর্ধ্বচারী আকাশপানে চেয়েছিলে নির্নিমেষ 
কৃষ্ণা দ্বাদশীর চাঁদে এত মায়া কেন
হৃদয় বাগিচায় বোধ করি ফুটেছিল গোলাপ বাহার। 
আলো আঁধারির মাঝে এই যে নিবিড়তা 
সোহাগ ভরা রাত, শরীরের শরীরকে ভালবাসা 
চাঁদ আর চকোরির মিলন, এযেন অমৃত আস্বাদ 
এর মধ্যে কোন পাপ নেই, প্রভাত আলোর মতই উদ্ভাসিত 
নিশি জাগা তারার মতই পবিত্র, ভোরের শিশিরের মতো সুন্দর
চাঁদের জ্যোৎস্নার মতো অকলঙ্ক, অমোঘ উর্ধ্বচারী অভিমুখ
অনিকেত বোধের মায়ায় আমাদের ক্রম উত্তরণ 
কালের মন্দিরে বাজে কালোত্তীর্ণের শঙ্খনাদ 
শব্দব্রহ্মের সারস্বত সাধনায় নিবিষ্ট কবি 
স্রোতময় অক্ষরের নিকোনো চারুকলা 
মনোভূমিতে আকাশ পৃথিবীর লুকোচুরি 
চারণক্ষেত, হিরণ্ময় ভোর, প্রভাতসংগীত 
শাশ্বত সনাতন: অন্তরে মোহ জাগায় 
মনে পড়ে চার্লস ডিকেন্সের অলিভার টুইস্ট, 
সেক্সপিয়রের রোমিও জুলিয়েট, হকিন্সের দি ব্ল্যাকহোল মিস্ট্রি,
একদিকে ভোগ, অন্যদিকে বৈরাগ্য 
একদিকে প্রেম, অন্যদিকে প্রণয়
একদিকে আকর্ষণ, অন্যদিকে নিঃশব্দ প্রত্যাখ্যান 
তোমার গঙ্গা, আমার যমুনা
তোমার ময়ূরাক্ষী, আমার শীতলক্ষ্যা 
অনন্ত প্রাপ্তির মায়ায় বোধ ও বোধির সংগম 
আমাদের ঈপ্সিত। আর কি বা চাই বলো?
এই যে বাসন্তি মেঘের আনাগোনা, জামদানি শাড়ির 
নক্সিকাঁথা পাড়, উঠানে শাল পলাশ মেহগনির সবুজ সমারোহ
প্রেমিক হৃদয়ের মন উচাটন, মুগ্ধ বিস্ময় 
রাত্রির নিবিড়তার মাঝে তুমি আর আমি 
আমাদের হৃদয়ের ধুকপুক, সোনালি স্বপ্নের কুঁড়ি 
সহস্র তারকা ভরা রাত, উজ্জ্বল মণিময় 
জীবন সমুদ্রে নাও বাইতে বন্ধুর পথে পতন 
বিচ্ছেদ ব্যথা: সেও অনুরাগ ছড়ায় কখনো সখনো 
অপ্রাপ্তির ফাগুয়া বড় মধুময় সে কেবল প্রেমিক জানে 
ভ্রমণের পথে ফুল কাঁটা দুই সমান 
তোমার অশ্রুর অন্তর্যামী ভাষা, অপলক চেয়ে থাকা 
বড্ড বেশী করে টানে, ভূমি ও ভূমার অন্বেষণে 
যেতে হবে কাজে, অনাদি সৃষ্টির খোঁজে 
মাটিতে লাশের গন্ধ মুছে, আত্মমগ্ন সময় 
যেতে হবে অপাপ বিদ্ধ পথে, মেঘেদের রথে 
শান্তির তপোবনে। শুদ্ধতার সুবাসিত জল সিঞ্চন করে
অগ্নিবলয়ের সামনে নিতে হবে
সুদৃঢ় প্রত্যয়, সত্যের শপথ।
বাউলের একতারায় টঙ্কার তুলে আমরা গাইব 
অভেদসুন্দরের বন্দনা গান,
গোধূলি বেলায় দিনের অন্তিম লগ্নে
খুঁজে নেব সেই পথ, যে পথে আঁধার নয় 
আছে শুধু আলো, অনন্ত আলো।





মাটি আর শেকড়ের গল্প

ন ব কু মা র  মা ই তি 

বাজপাখির ডানায় ভর করে চলেছি দু'জনে,
মাঝখানে সীমান্ত চৌকি,
আর ধূসর স্মৃতির ক্যানভাস
মনে পড়ে মাটি আর শেকড়ের গল্প 
জ্যোৎস্নায় ডুবে ছিলো নিথর রাত্রি।
শব্দহীন পৃথিবীতে শুধু স্বপ্ন রচনা করেছি দু'জনে।
আজ নেই শুধু স্বপ্নলোকের চাবি।





উপপাদ্য

চি র ঞ্জী ব  হা ল দা র

ক:
যোদ্ধাদের নিজস্ব কোন ইচ্ছে থাকে না। ইতস্তত ছোটাছুটির কারণ জিজ্ঞেস করলে তোতলানো ছাড়া তাদের কোন উপায় থাকে না।
 
খ:
একটা গাছ যখন অন্ধকারে বেড়ে ওঠে 
সে ভাবতেই পারে সূর্য তার ভয়ে মুখ লুকিয়ে আছে হয়তো।

গ:
আকাশকে খুশি করার জন্য ঢোল বাদকরা ননস্টপ হাত চালিয়ে চলেছে। তাদের দুহাত যেন আজন্ম দাসত্বের স্মারক হয়ে উঠছে।

ঘ:
কুমির দিয়ে বাক্য রচনা করতে বললে অবধারিত বাঘের ডাক শুনতে পারে।

ঙ:
একটা ডিমকে গড়িয়ে দাও।
অভ্যন্তরীণ পচন না ধরা পর্যন্ত সে নিরপেক্ষ বাতাসের গায়ে হেলান দিয়ে থাকবে।

চ:
 বিলুপ্তি একটি ক্রিয়া।
 তার কোন নায়ক নেই। 

ছ:
পৃথিবীতে  ক্রিটিক অফ পোয়েট্রি নামের কোন পুস্তক আছে কিনা জানা হয়নি।
সম্ভবত তার প্রকাশক প্রকৃত অন্ধত্বের দাবি করতে পারে। 

জ:
ডিম গড়াতে গড়াতেই অপরিহার্য শব্দের কাছ ঘেঁষে প্রশ্ন করে তার জিনে কত শতাংশ অসহায় শূন্যতার ভূমিকা থাকা জরুরী।





কবিতাগুচ্ছ

দে বা ঙ্গ না  ঘো ষ

 ১.             
একরাশ আশা বড়ো হ‌ওয়ার
অট্টালিকা ছাড়িয়ে, এভারেস্ট
ঠিক যতটা বড়ো হলে 
কাউকে ছোট লাগবে না 
শশ্মান ভূমিতে বাগান হবে 
আমার বাগানে, আস্ত ভ্রমরা 

২.
নিরুদ্দেশের এক পথিক,
নাকি ফেরিওয়ালা ও?
আলাদিনের প্রদীপ বেচে
ইচ্ছে মত স্বপ্ন বোনে,

৩.
টিনের চালে জং ধরেছে 
অসময়ের বৃষ্টিধারায়,
আমার ঘর ভাসে রোজ...
ভোর রাতের স্বপ্ন ইতি!

৪.
একরাশ আশা, পান্তা ভাতে 
 লহমায় গুঙরে কাঁদে!
মায়ের ধুলোমাখা আঁচলে,
আমি মুখ গুঁজে থাকি...





কবিতাগুচ্ছ

বি ধা ন  দ ত্ত

১.
স্বর্গের দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি! 
জানিনা প্রহরী এসে ফিরে গেছে কিনা।

২.
মুক্ত থেকেও বন্দী হয়েছি
বন্দী থেকেও মুক্ত,
যুক্ত থেকেও পৃথক হয়েছি, 
পৃথক থেকেও যুক্ত। 

৩.
অশরীরী  নির্বাণ পথে 
কতবার হেঁটে গেছি শূন্যে
বেহালার তার জুড়ে 
কাটাকুটি খেলে পাপ পুণ্যে। 

৪.
দেখানোর আর কী আছে তোমায়,
আগল দিয়েছি খুলে,
শোনানোর সব কথা বিস্তৃত 
অতীত গিয়েছি ভুলে।

৫.
তবু কিছু কথা না বলাই থাক,
কিছু স্মৃতি ভুলে থাকাই শ্রেয়। 
মনের গহীনে কিছু চাপা বেদনা,
যতটুকু অনাদরে করেছিলে হেয়।

৬.
বোধের ভেতরে এক চেতনার জল, 
বিন্দু বিন্দু ঝরে পড়ে টুপটাপ স্বরে, অহেতুক কেউ এসে কড়া নেড়ে বলে কতটুকু জল পড়ে কলস ভরে?





দূরপাল্লা

কি র ণ

১.
দূরপাল্লার ট্রেনের সাথে
তীব্র পালাচ্ছে সারি সারি গাছ, তারা, ল্যাম্পপোষ্ট,
আবছা ভেসে উঠে মুখ
আর মায়া পাখির ঘ্রাণ থেকে ফিনিক্স হয়ে উঠছো তুমি।

২.
বহুকাল হল
ডুমুর ফুল তুমি,
সুরমা সুরমা দিনে জল অতিক্রান্ত হলে
দীর্ঘশ্বাসের আড়াল থেকে—
"যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনারতরী।"

৩.
যতদূর চোখ যায়
তোমার বিকিরণে স্নান করি দু একবার
আধঘন্টা থেকে তোমায় দেখবার অভিলাষ
অথচ আমায় গোধূলি ভেবে চলে যাচ্ছ।





কবিতাগুচ্ছ

সু শা ন্ত  সে ন

১. 
কুলো

বলতে পারেন কুলো কখন লাগে?

আরো বিষদ ভাবে বলতে গেলে
ভাঙ্গা কুলো কখন লাগে?

আগে জেনে ছিলাম ছাই ফেলতে,
এখন চারপাশ পুড়ে ছাই
কোথায় আর ফেলবেন
চারপাশে চাপ চাপ ছাই জমে
পাহাড় হয়ে আছে!

তাই এখন কুলোগুলো, ভাঙ্গা কুলোগুলো
জোগাড় করে রাখুন,
এককাট্টা করে কুলোর বাতাস দিয়ে
সরিয়ে ফেলার, ঝেঁটিয়ে বিদায় করার
সময় এসেছে— সারা শহরের যত পুড়ে যাওয়া ছাই।


২.
কবিতা

লেখা'টি মনের মত হয় না কিছুতেই
সহজলভ্য নয় সাহিত্যাধিকার!

সাগর মন্থনে কৌস্তুভ মনি উঠলেই
শ্রীবিষ্ণু তাকে নিয়ে নিলেন।

হলাহল নিয়ে সময় কাটিয়ে
বুকে নিয়ে তৃষ্ণা  
চেষ্টা করি অমল ধবল পালে
নৌকায় সফরকারী হয়ে
দিনান্তের দিকে চলে যেতে।

বিষণ্ন সন্ধ্যায় কাঁপে থরথর বায়ু স্রোত
কবিত্ব প্রকাশ পায় না 
লেখনীতে।

স্তব্ধ , শুধু বসে থাকি।


৩.
তুমি

তুমি তো থেকেও নেই , তুমি আর আসিলে না
                            এইখানে শীতল ছায়ায়
ধীরে এসে ধরিলে না হাত।
তোমার নরম স্পর্শ নেবো বলে প্রতীক্ষায় কেটে
                  যায় বেলা, 
                      কেটে যায় বিষণ্ণ দুপুর
নদীকুলে সর্পিল নাচের ছন্দ পায়ে পায়ে 
      নেচে ওঠে নিক্কন নূপুরে— তুমি ক্লান্তিহীন।
ভেসে থাকি নদীবক্ষে মৃণাল হংসের ন্যায় 
                            তৃষ্ণার্তও হই,
কম্পিত তুলিতে আঁকি তোমার দেহের রেখা
                    তোমার আঁচল তোমার ভ্রুকুটি,
পাশে কাঁপে আকন্দ ফুলের গাছ এবং বিকেল।
কোথায় বসেছো তুমি কোন তরুতলে
         ভেবে ভেবে জীবন অস্থির,
তুমি তো থেকেও নেই,  তুমি আর পাশে থাক না
                        কখনো কোনদিন।





কবিতাগুচ্ছ

শু ভ শ্রী  রা য়

১. 
ফুঁ

লেবু তেঁতুল টক, ঝাল লঙ্কার ধক
ভারি কথা নেহাত কম, হাল্কা হরদম,
ফুঁয়েই বাঁচা শেষ, কিসের থাকে রেশ?
কারুর বিচার তাই, করতে তো না চাই!


২. 
তুচ্ছ

একটু বেশি থেকে যাওয়ার জন্য কত কী!
কখনো এমনি ভাত, কখনো তপ্ত ভাতে ঘি,
মেপে চেপে কথাবার্তা, সঙ্গে সহস্র কৌশল;
তবু মরণ এসে সরিয়ে দেয় সমস্ত ছলবল!


৩. 
ধাঁধার ব্যাপারী

কৌশলী তুমি তুমুল ধাঁধার ব্যাপারী,
তোমার কাছে আমরা ধুলোরই মতো,
শক্তির কোনো তুলনা মোটেই হয় না;
আমাদের নিয়ে খেলাধুলো কেন এত?

সোজা চললেও সেই পথ দাও ঘুরিয়ে,
কী-কেন হ'চ্ছে কিচ্ছু বুঝতে না পারি,
ক্রমশ শক্ত হয়ে খুঁজে নিই ঠিক রাস্তা;
জানো খালি তুমি রহস্যময় ব্যাপারই!





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পঞ্চম বর্ষ || প্রথম ওয়েব সংস্করণ || শারদ সংখ্যা || ১১ কার্তিক ১৪৩২ || ২৯ অক্টোবর ২০২৫

চতুর্থ বর্ষ || চতুর্থ ওয়েব সংস্করণ || বাদল সংখ্যা || ১২ শ্রাবণ ১৪৩২ || ২৯ জুলাই ২০২৫

কবিতা